জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক এবং ক্লিয়ারেন্স শাখার পরিচালক মোজাদ্দেদ মো. তাজিম-উর-রহমানের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সার্বিয়ার বিতর্কিত আইটি কোম্পানি লজিক্কা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সলিউশনস ডিওওতে কর্মী পাঠানোর ছাড়পত্র দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, যথাযথ তদারকি ও যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। রিক্রুটিং এজেন্সি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে এসব অনিয়ম করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পূর্ব ইউরোপের সার্বিয়ার মতো সংবেদনশীল বা নতুন কোনো দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের যাচাই-বাছাই এবং আনুষ্ঠানিক পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পূর্ব ইউরোপের এসব দেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে অনেকে অবৈধভাবে পশ্চিম ইউরোপের শেনজেনভুক্ত দেশগুলোতে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ কারণে মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে থাকলেও বিএমইটির তাজিম-উর-রহমানের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে নিজেদের মতো করে কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারের মূল তদারকি সংস্থাকে উপেক্ষা করে বিএমইটির ক্লিয়ারেন্স শাখা ‘লজিক্কা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সলিউশনস ডিওও’ (Logikka Artificial Intelligence Solutions d.o.o.) নামের প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ফাইল অনুমোদন দিচ্ছে। মন্ত্রণালয়কে পাশ কাটিয়ে এ ধরনের ছাড়পত্র দেওয়ার ঘটনাকে নজিরবিহীন উল্লেখ করে অভিযোগে বলা হয়েছে, এটি বিদ্যমান অভিবাসন আইনের লঙ্ঘন।
সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির ওপর প্রকাশিত একটি ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বেশ কিছু অসংগতির তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিকে একটি নামীদামি তথ্যপ্রযুক্তি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কোম্পানি হিসেবে উপস্থাপন করে চাকরিপ্রত্যাশীদের আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দেখাচ্ছে একটি প্রতারক চক্র। অথচ কোম্পানিটির নিজস্ব ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এর জনবল মাত্র দুইজন। অন্যদিকে, সার্বিয়ার সরকারি দপ্তরে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত কাজের ধরন ‘অন্যান্য বিশেষায়িত নির্মাণকাজ’।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, কোম্পানিটির বার্ষিক মোট আয় মাত্র ২১ লাখ ৪৬ হাজার সার্বিয়ান দিনার, যা প্রায় ১৯ থেকে ২০ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। এই আয় দিয়ে একজন কর্মীর বার্ষিক সর্বনিম্ন বেতন ও আনুষঙ্গিক পরিচালন ব্যয় মেটানোও পুরোপুরি অসম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিদেশ থেকে কর্মী এনে নিয়মিত বেতন-ভাতা দেওয়ার মতো ন্যূনতম অর্থনৈতিক সক্ষমতাও প্রতিষ্ঠানটির নেই বলে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি মূলত সাভো ক্লিকোভাক নামের এক ব্যক্তির মালিকানাধীন একটি অতি ক্ষুদ্র পেপার কোম্পানি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩-এর ৩১ ধারা অনুযায়ী, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অর্থ গ্রহণ এবং অবৈধভাবে বিদেশে কর্মী পাঠানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে বিএমইটির ভেতরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এসব জালিয়াতির তথ্য জানা সত্ত্বেও নিজেদের আর্থিক সুবিধার জন্য দ্রুততার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফাইলের ছাড়পত্র দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দালাল চক্রগুলো আইটি খাতে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ কর্মীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নথিপত্রে গুরুতর জালিয়াতি এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না থাকায় সার্বিয়ার কঠোর অভিবাসন আইনের আওতায় যেকোনো সময় এসব কর্মীর ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসা বাতিল হতে পারে। এতে কর্মীরা অবৈধ অবস্থায় পড়ার পাশাপাশি সার্বিয়ান পুলিশের হাতে আটক হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ের নজরদারি এড়িয়ে বিতর্কিত কোম্পানিটির ফাইল অনুমোদনের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিএমইটির মহাপরিচালক এবং ক্লিয়ারেন্স শাখার পরিচালক মো. তাজিম-উর-রহমানসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁদের কেউই ফোন ধরেননি। তাঁদের ফোনে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উল্লেখ করে খুদে বার্তা বা এসএমএস পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বিদেশে গিয়ে আর্থিক ক্ষতি বা গুরুতর আইনি জটিলতায় পড়ার আগেই যেকোনো রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ফাইল প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অনুমোদন মন্ত্রণালয় ও বিএমইটির কেন্দ্রীয় সার্ভারে বৈধভাবে রয়েছে কি না, তা দেশ ছাড়ার আগে সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা দরকার।



