নদী-খাল-সড়কে বর্জ্যের স্তূপ, ডাম্পিং স্টেশনহীন সোনারগাঁও

ঐতিহাসিক ও পর্যটনসমৃদ্ধ উপজেলা নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসে এখানকার ঐতিহাসিক স্থাপনা ও পর্যটনকেন্দ্র দেখতে। অথচ সেই সোনারগাঁওয়ের বিভিন্ন সড়ক, খাল, নদী ও খোলা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। কোথাও জমেছে পচা বর্জ্যের স্তূপ, কোথাও আবার নদী-খালে সরাসরি ফেলা হচ্ছে গৃহস্থালি ও বাজারের ময়লা। নেই পরিকল্পিত ও স্থায়ী ডাম্পিং ব্যবস্থা।
ফলে একদিকে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বাড়ছে, অন্যদিকে দুর্গন্ধ ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বৃষ্টির পানিতে বর্জ্য ভেসে ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের এলাকায়। এতে দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সোনারগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর বিসিক শিল্পনগরীর আশপাশ, পিরোজপুর ইউনিয়নের আষাঢ়িয়ার চর, মোগরাপাড়া ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া, মোগরাপাড়া চৌরাস্তা কাঁচাবাজারসংলগ্ন মেনিখালি নদীর তীরসহ বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য জমে রয়েছে।
পৌর এলাকার আদমপুর লেক সিটি, ভবনাথপুর, উদ্ধবগঞ্জ পঙ্খীরাজ খাল, দিঘীরপাড় ও টিপরদী গ্রামের পাশের খাল ও খোলা স্থানেও একই চিত্র দেখা গেছে। বিভিন্ন জায়গায় বাজারের উচ্ছিষ্ট, পলিথিন, প্লাস্টিকসহ নানা ধরনের বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়।
বিশেষ করে জনবহুল মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় বর্জ্যের স্তূপ স্থানীয়দের পাশাপাশি প্রতিদিনের যাত্রী ও পথচারীদেরও বিড়ম্বনায় ফেলছে। বৃষ্টির সময় এসব বর্জ্য পানির সঙ্গে মিশে দুর্গন্ধযুক্ত নোংরা পরিবেশের সৃষ্টি করছে।
নির্দিষ্ট বর্জ্য ফেলার জায়গা না থাকায় নদী ও খালও রেহাই পাচ্ছে না। বাসাবাড়ি ও বাজারের বর্জ্যের একটি অংশ পানিতে গিয়ে পড়ছে। ফলে পানিদূষণের পাশাপাশি নদী-খালের স্বাভাবিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে আশপাশের খোলা জায়গা, খাল কিংবা নদীতে বর্জ্য ফেলছেন। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চললেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে।
স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রশাসনিক ব্যবস্থায় অস্থিরতার সুযোগে সোনারগাঁও পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে থাকা সাতটি ডাস্টবিন রাতের আঁধারে চুরি হয়ে যায়। এরপর পৌর এলাকায় কার্যকর ডাস্টবিন ব্যবস্থা না থাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়মিত বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করতেন। বর্তমানে অনেক এলাকায় দীর্ঘ বিরতিতে বর্জ্য অপসারণ করা হয়। ফলে বাসাবাড়িতে বর্জ্য জমে থাকছে। শেষ পর্যন্ত এসব বর্জ্য রাস্তার পাশে কিংবা খোলা জায়গায় ফেলে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
পিরোজপুর গ্রামের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, “বাসাবাড়ির বর্জ্য কোথায় ফেলব, তার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। অনেকে তাই নদীতে ময়লা ফেলছেন। এতে নদীর পানি নষ্ট হচ্ছে, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে।”
মোগরাপাড়া চৌরাস্তার বাসিন্দা আশরাফুল আলম বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ যাতায়াত করেন। অথচ ময়লার দুর্গন্ধে এখানে দাঁড়ানোও কঠিন হয়ে পড়ে। বৃষ্টি হলে ময়লার পানি আশপাশে ছড়িয়ে যায় এবং নদীর পানিও দূষিত হয়।
পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, সোনারগাঁও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা। এখানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটক আসেন। ফলে পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকার পাশাপাশি পুরো পৌরসভা ও উপজেলায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকলে শুধু পরিবেশ নয়, পর্যটন খাতের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দ্রুত পরিকল্পিত বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
সোনারগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত বলেন, সেতুর নিচে ময়লার স্তূপ তৈরি হওয়া দুঃখজনক। সমস্যা সমাধানে প্রশাসন ইতোমধ্যে অভিযান পরিচালনা করেছে। কিছু বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট এলাকায় ময়লা না ফেলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে তিন ধাপে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ করে সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিষ্কার করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে বর্জ্য ফেলা বন্ধে নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তৃতীয় ধাপে উপজেলা পর্যায়ে পরিবেশসম্মত স্থায়ী ডাম্পিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। স্থায়ী ডাম্পিংয়ের জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে। উপযুক্ত জায়গা পাওয়া গেলে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু ময়লার স্তূপ সরিয়ে ছবি তোলার মধ্যে যেন পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না থাকে। বর্জ্য কোথা থেকে আসছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কীভাবে পরিবেশসম্মতভাবে তা নিষ্পত্তি করা হবে—এসব বিষয়কে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা এবং নদী-খালে বর্জ্য ফেলার বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি—এই চারটি ব্যবস্থা একসঙ্গে কার্যকর করা না গেলে সোনারগাঁওয়ের বর্জ্য সংকট সহজে কাটবে না।
এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসনে প্রশাসনের ঘোষিত তিন ধাপের পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং নদী-খাল ও জনপদকে বর্জ্যের কবল থেকে কতটা মুক্ত করা সম্ভব হয়।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

চরভদ্রাসনে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখার প্রত্যয় নেতাকর্মীদের

ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা

Scroll to Top