দিনাজপুরের বীরগঞ্জে প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘বউ মেলা’ ঘিরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলা বসেছে। শারদীয় দুর্গাপূজা শেষে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত এ মেলায় তরুণ-তরুণীদের পছন্দের জীবনসঙ্গী খোঁজার সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি এটি পরিণত হয়েছে সম্প্রদায়টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে।
উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত এ মেলা স্থানীয়ভাবে ‘বাসিয়াহাট মেলা’ নামেও পরিচিত। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রেখে প্রতিবছর দূর-দূরান্ত থেকে নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী ও বিভিন্ন বয়সী মানুষ এতে অংশ নেন।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের জীবনসঙ্গী পছন্দের সুযোগ। মেলায় এসে তাঁরা নিজেদের মধ্যে পরিচিত হন, কথা বলেন এবং পছন্দের মানুষকে বেছে নেওয়ার সুযোগ পান। পরবর্তী সময়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে দুই পক্ষের সম্মতিতে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে মেলায় এসে তাৎক্ষণিক বিয়ে করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; বরং জীবনসঙ্গী পছন্দ ও পরিচিত হওয়ার একটি সামাজিক পরিসর হিসেবেই এ আয়োজনের গুরুত্ব রয়েছে।
মেলাকে কেন্দ্র করে মাঠজুড়ে বসে নানা ধরনের দোকানপাট। মাটির তৈরি সামগ্রী, খেলনা, প্রসাধনী, মিষ্টি, পিঠা-পুলিসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের পদচারণায় উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
এ আয়োজনের আরেকটি আকর্ষণ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান। ঢোল, মন্দিরা ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের তালে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে মেলার পরিবেশ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। এর মধ্য দিয়ে নিজস্ব সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রকাশ ঘটে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আধুনিকতার প্রভাবে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এলেও দীর্ঘদিনের এ ঐতিহ্য এখনও ধরে রেখেছেন তাঁরা। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পুরোনো সংস্কৃতির যোগসূত্র তৈরি, পারস্পরিক পরিচিতি বৃদ্ধি এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতে মেলাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সব মিলিয়ে বীরগঞ্জের এই ‘বউ মেলা’ কেবল জীবনসঙ্গী খোঁজার আয়োজন নয়; এটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলা। প্রায় দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য বহন করে মেলাটি আজও স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে টিকে রয়েছে।




