লাকসাম প্রেস ক্লাবের কমিটি এমপির হাতে? ‘আমি প্রেস ক্লাবের প্যাডে কমিটি দিয়েছি’—আবুল কালাম

কুমিল্লার লাকসাম উপজেলা প্রেস ক্লাবের কমিটি গঠন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাংবাদিকদের সংগঠনের নেতৃত্ব নির্ধারণে সাধারণ সভা, সদস্যদের মতামত কিংবা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পরিবর্তে স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশনা কতটা ভূমিকা রেখেছে—এ নিয়েই এখন আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কারণ, পাঁচ সদস্যের নতুন কমিটি ঘোষণায় কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. আবুল কালামের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর এমপি নিজেও বলেছেন, ‘আমি আংশিক কমিটি দিয়েছি। আমি প্রেস ক্লাবের প্যাডে কমিটি দিয়েছি।’

সোমবার প্রকাশিত নতুন কমিটিতে মুজিবুর রহমান দুলালকে সভাপতি, মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক, তমিজ উদ্দিন আহম্মদ চুন্নুকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সেলিম চৌধুরী হীরাকে সাংগঠনিক সম্পাদক এবং এম. এ জলিলকে প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক করা হয়েছে। প্রকাশিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, লাকসামে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক প্রেস ক্লাব ও সাংবাদিক সংগঠন থাকায় গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে ঐক্যের ঘাটতি রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা ও প্রকৃত গণমাধ্যমকর্মীদের মান-মর্যাদা রক্ষার লক্ষ্যে এমপি আবুল কালামের নির্দেশে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—একটি সাংবাদিক সংগঠনের সাংগঠনিক নেতৃত্ব নির্ধারণে একজন সংসদ সদস্যের সরাসরি ভূমিকার প্রয়োজন হলো কেন? বিশেষ করে এর আগে ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর লাকসাম প্রেস ক্লাবের সাধারণ সভায় উপস্থিত সাংবাদিক সদস্যদের কণ্ঠভোটে ৩১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটিতে মশিউর রহমান সেলিম সভাপতি, মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন সাধারণ সম্পাদক এবং এমএ মান্নান সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

নতুন কমিটি ঘোষণার প্রক্রিয়ায় আগের কমিটির কী হলো, সাধারণ সদস্যদের সভা বা মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না এবং প্রেস ক্লাবের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কমিটি গঠনের কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মাসুক আলতাফ চৌধুরী ‘আমার দেশ’-কে বলেন, ‘বিষয়টি মারাত্মক। কুমিল্লার সাবেক এমপি বাহার সাংবাদিকতায় হস্তক্ষেপ করতেন। আজকে দেখলাম লাকসাম প্রেস ক্লাবেও একই চিত্র। কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।’

কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ আহমেদ জিতু বলেন, ‘একজন এমপি উপজেলা প্রেস ক্লাবের কমিটি দিয়েছেন—এটা লজ্জাজনক। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের ওপর হস্তক্ষেপ। যদি বিষয়টি সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।’

নবগঠিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে পরে কথা বলবো।’

অন্যদিকে, কমিটি গঠনে নিজের ভূমিকার বিষয়ে জানতে চাইলে এমপি আবুল কালাম বলেন, ‘আমি আংশিক কমিটি দিয়েছি। আমি প্রেস ক্লাবের প্যাডে কমিটি দিয়েছি।’

প্রেস ক্লাব কোনো দলীয় সংগঠন নয়—এ অবস্থায় একজন সংসদ সদস্য হিসেবে প্রেস ক্লাবের কমিটি দেওয়ার এখতিয়ার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার এলাকা হিসেবে আমি কমিটি দিয়েছি। এ বিষয়ে আমি আমার উপরস্থ মহলের কথা বলেছি। আমার দলের সঙ্গে কথা বলে দিয়েছি। আমি তো আইনপ্রণেতা হিসেবে নতুন এসেছি।’

এর আগে চলতি বছরের মার্চে লাকসাম প্রেস ক্লাবের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ইফতার ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এমপি আবুল কালাম। ওই সময় প্রেস ক্লাবের নেতৃত্বে ছিলেন অন্যরা।

ফলে কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রেস ক্লাবের নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং নতুন পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠনে সংসদ সদস্যের সরাসরি ভূমিকার বিষয়টি সামনে আসায় সাংবাদিকদের সংগঠনটির সাংগঠনিক স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে যে সংগঠনকে গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীন কণ্ঠ হিসেবে কাজ করার কথা, সেই সংগঠনের নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়াই যদি রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নে পড়ে, তাহলে কমিটির গ্রহণযোগ্যতা ও স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এখন মূল প্রশ্ন—লাকসাম প্রেস ক্লাবের নতুন কমিটি কি সাংবাদিকদের সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে গঠিত, নাকি একজন জনপ্রতিনিধির নির্দেশনায়? এ প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট করতে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া, গঠনতন্ত্র এবং সাধারণ সদস্যদের ভূমিকা প্রকাশের দাবি উঠেছে।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

চরভদ্রাসনে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখার প্রত্যয় নেতাকর্মীদের

ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা

Scroll to Top