দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় কৃষি অফিসের মাধ্যমে বিতরণ করা ফলজ চারার মান, সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ফলজ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় বিতরণ করা চারার একটি বড় অংশই ছিল অতি নিম্নমানের ও রোগাক্রান্ত। অন্যদিকে, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার হাতে সংবাদকর্মী লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
অর্ধেকের বেশি চারা মৃত, শিক্ষকদের ক্ষোভ
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে ৫০ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে চিরিরবন্দর উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট ২,২৬০টি ফলজ চারা বিতরণ করা হয়। তবে চারার সরবরাহ পাওয়ার পর থেকেই এর গুণগত মান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। রোপণের কয়েক দিনের মধ্যেই সিংহভাগ চারা শুকিয়ে মারা গেছে বলে সরেজমিনে জানা গেছে।
কালিগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাবেয়া বেগম আক্ষেপ করে বলেন, “কৃষি অফিস থেকে পাওয়া চারাগুলো এতটাই নিম্নমানের ছিল যে ভালো জমিতে রোপণ ও সঠিক পরিচর্যার পরও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।” একই অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে উচিৎপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মমিন ইসলাম জানান, রোপণের কিছুদিন পরেই চারাগুলো মরে যায়।
চারা এতটাই খারাপ ছিল যে তা গ্রহণ করতেই অস্বীকৃতি জানান বিঝট্রি উন্নয়ন গ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. তোফাজ্জল হোসেন। তিনি বলেন, “চারাগুলোর অবস্থা দেখে আমি সেগুলো গ্রহণ করিনি।” তবে খেড়কাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফেরদৌসী বেগমের দাবি, তাদের দেওয়া চারার মান ভালোই ছিল।
তথ্য দিতে গড়িমসি ও সাংবাদিক লাঞ্ছনা
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির বরাদ্দ ও চারার মান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অভিযোগ অস্বীকার করেন চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা। তিনি দাবি করেন, “উপজেলা কমিটির উপস্থিতিতেই ভালো মানের চারা বিতরণ করা হয়েছে।” চারা রোপণে মোট কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল—এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি লিখিতভাবে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পরামর্শ দেন।
এদিকে, কৃষি অফিসের বিরুদ্ধে সার ডিলার নিয়োগে বাণিজ্যিক সুবিধা গ্রহণ, স্বজনপ্রীতি এবং পছন্দের মানুষকে সরকারি প্রণোদনা ও চারা বিতরণের অভিযোগ বহুদিনের। এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে একজন সংবাদকর্মী অপমানের শিকার হন। অভিযোগ উঠেছে, কৃষি কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং সংবাদকর্মীকে কার্যালয় থেকে বের করে দেন।
স্থানীয় অসন্তোষ ও রাজনৈতিক প্রভাব
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগে এবং স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তির (বিএনপি নেতাকর্মীদের) সাথে আঁতাত করে কৃষি কর্মকর্তা দাপট দেখিয়ে চলছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, অনিয়মই এখন এই অফিসের নিয়মে পরিণত হয়েছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
উপজেলা প্রশাসনের বক্তব্য
বিষয়টি নিয়ে চিরিরবন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেহা তূজ জোহরা জানান, “গাছগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জিম্মায় দেওয়া হয়েছিল। চারাগুলো টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব তাদের। তবে লিখিত কোনো অভিযোগ এখনো পাইনি। অভিযোগ পেলে মরে যাওয়া চারাগুলো পরিবর্তন বা রিপ্লেস করে দেওয়া হবে।”
কৃষি কর্মকর্তার এমন একচ্ছত্র প্রভাব, অনিয়ম ও পেশাগত আচরণের চরম লঙ্ঘনে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ। তারা কৃষিখাতের এই দুর্নীতি বন্ধে অনতিবিলম্বে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন




