ইজারা ছাড়া বালি লুট বিপন্ন পূর্ব বাংলা বাজার মরাগাঙ্গ বা খাসিয়ামারা নদী নীরব প্রশাসন

সীমান্তবর্তী জেলা সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায় সরকারি সব আইন-কানুন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শুরু হয়েছে এক অশুভ প্রতিযোগিতা। উপজেলার পূর্ব বাংলা বাজার ইউনিয়নের বড়খাল বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন স্থানীয়দের কাছে মরা গাঙ্গ নামে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী খাসিয়ামারা নদীটি এখন এক সংঘবদ্ধ বালুখেকো চক্রের দখলে। কোনো প্রকার সরকারি ইজারা বা অনুমতি ছাড়াই নদীটির বুক চিরে প্রতিদিন তুলে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকার বালু। একদিকে সরকারি কোষাগার থেকে উধাও হচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব, অন্যদিকে বেপরোয়া ড্রেজিংয়ের ফলে বিলীন হতে বসেছে চারপাশের লোকালয় ও নদীতীরবর্তী বসতভিটা।
সরেজমিনে অনুসরণে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর চিত্র। লোকচক্ষুর অন্তরালে কাজ চালাতে অভিনব পথ বেছে নিয়েছে এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। ইউনিয়নের ঢালিয়া গ্রামের মোহনা এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বাঁশঝাড় ও ঘন গাছপালার আড়ালকে ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ কারবারের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে। ওই ঝাড়ের অন্তরালেই দিন রাত সমান তালে বড় বড় ট্রলি ট্রাক ভরে পাচার করছে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। সেখান থেকে প্রতিদিন ড্রেজিং করে বালু তুলে পূর্ণ করা হচ্ছে শত শত ভলগেট ও ট্রলার। এরপর তা পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। নদীর প্রাকৃতিক তলদেশ ক্ষতবিক্ষত করে গড়ে তোলা হয়েছে এক অপ্রতিরোধ্য বালু সাম্রাজ্য।
​
নদী থেকে অনিয়ন্ত্রিত ও অবিরামভাবে অতিরিক্ত গভীরতায় বালু উত্তোলনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে খাসিয়ামারা নদীর দুপাশের দীর্ঘ ভূখণ্ড। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। স্থানীয়দের আশঙ্কা আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগেই যদি এই তাণ্ডব বন্ধ না হয় তবে পুরো ঢালিয়া গ্রামসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা মানচিত্র থেকে মুছে যেতে পারে।
​
একাধিক সূত্রের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও বালি কারবারের মূলহোতাদের নাম জানতে চরম বাধার সম্মুখীন হতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে চেপে বসেছে এক অদৃশ্য আতঙ্কের ছায়া। নাম প্রকাশ না করার চরম আকুতি জানিয়ে কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা জানান বালি বিক্রির পেছনে যারা রয়েছে তাদের হাত অনেক লম্বা। স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সমাজের উচ্চস্তর পর্যন্ত তাদের দাপট। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ তাদের নাম প্রকাশ্যে বললে কালকেই ভিটামাটি ছাড়তে হবে নয় তো মিথ্যা মামলা আর হামলার শিকার হতে হবে। এই চরম দাপট ও ভয়ভীতির কারণেই কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ দিনদুপুরে লুট হয়ে গেলেও ভয়ে কেউ এককভাবে চক্রের সদস্যদের নাম বলতে সাহস পাচ্ছেন না।
​
স্থানীয়দের অভিযোগ এর আগেও একাধিক জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে এই অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে বেশ কয়েকবার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই রহস্যজনক কারণে বিষয়টি এড়িয়ে গেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কোনো স্থায়ী আইনি পদক্ষেপ বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান না থাকায় চক্রটি দিন দিন আরও বেপরোয়া ও দুর্ধর্ষ হয়ে উঠেছে। সামান্য কিছুদিন নামকাওয়াস্তে কার্যক্রম থমকে গেলেও সুযোগ বুঝে আবারও পুরোদমে শুরু হয় এই হরিলুট। সরকারি রাজস্ব আয় যেখানে এক টাকাও হচ্ছে না, সেখানে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর পকেটে ঢুকছে কোটি কোটি টাকা।
পরিবেশ ও রাজস্ব রক্ষায় আর কোনো অবহেলা সহ্য করার মতো পরিস্থিতি নেই বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। বড়খাল বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন মরা গাঙ্গ ও খাসিয়ামারা নদীর অস্তিত্ব বাঁচাতে অনতিবিলম্বে টাস্কফোর্সের সমন্বয়ে কঠোর সাঁড়াশি অভিযান চালানোর জোর দাবি উঠেছে। স্থানীয় ভুক্তভোগীদের একটাই আকুল আকুতি।জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন যেন অবিলম্বে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে অবৈধ বালু উত্তোলন চিরতরে বন্ধ করে এবং এই পরিবেশবিধ্বংসী সিন্ডিকেটের মূলহোতাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করে।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top