ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার ডুমাইন ইউনিয়নের পঞ্চপল্লীতে দুই সহোদর নির্মাণশ্রমিককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহ মো. আসাদুজ্জামান তপনকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দুই বছর আগে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এই জনপ্রতিনিধি আবারও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বলে স্থানীয়ভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী এবং কৃষক দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একজন নেতার ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় পঞ্চপল্লী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের একটি কালীমন্দিরের প্রতিমার শাড়িতে আগুন লাগার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মাণশ্রমিকদের বিরুদ্ধে সন্দেহ ছড়ায়। পরে বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে দুই সহোদর আশরাফুল খান ও আরশাদুল খান নিহত হন। তাঁদের বাড়ি মধুখালী উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নের চোপেরঘাট গ্রামে। তাঁদের বাবা মো. শাহজাহান খান।
নিহতদের বাবার অভিযোগ ছিল, ঘটনার কয়েক দিন আগে স্থানীয় ইউপি সদস্য অজিত কুমার বিশ্বাসের চাঁদা দাবি নিয়ে তাঁর ছেলেদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে চেয়ারম্যান শাহ মো. আসাদুজ্জামান তপন ও ইউপি সদস্য অজিত কুমার বিশ্বাসের নেতৃত্বে তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও হামলার সময় চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যকে মারধরে অংশ নিতে দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে।
তিন মামলা, গ্রেপ্তার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা
ঘটনার পর নিহতদের বাবা শাহজাহান খান বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। পাশাপাশি মন্দিরে অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে আরও দুটি পৃথক মামলা হয়।
এ ঘটনায় বিভিন্ন মামলায় ১২ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশিত হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন উজ্জল কুমার মিত্র, বিশ্বজিৎ মল্লিক, কনক বিশ্বাস, তপন কুমার মণ্ডল, অনুপ রায়, টুটুল চন্দ্র মণ্ডল, প্রসেনজিৎ সরকার, সুজয় বিশ্বাস, বিনয় সাহা, উজ্জল কুমার বিশ্বাস, গোবিন্দ সরকার ও অনয় ভাদুড়ী। তাঁদের কয়েকজন পরবর্তী সময়ে জামিন পান বলে জানা যায়।
জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তৎকালীন চেয়ারম্যান শাহ মো. আসাদুজ্জামান তপন, ইউপি সদস্য অজিত কুমার বিশ্বাস ও গ্রাম পুলিশ সদস্য অমৃত কুমার বসুর সংশ্লিষ্টতার বিষয় উঠে আসে। তদন্তে নির্মাণশ্রমিকদের মন্দিরে আগুন দেওয়ার কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের ২৬ এপ্রিল জেলা প্রশাসন চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যকে ধরিয়ে দিতে সহায়তাকারীদের জন্য পুরস্কার ঘোষণার কথা জানায়। পরবর্তী সময়ে ৭ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগ তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করে। ৮ জুলাই মধুখালী উপজেলা প্রশাসন তাঁদের পদ শূন্য ঘোষণা করে।
২০২৫ সালের ১৬ জুলাই পর্যন্ত প্রকাশিত মামলার অগ্রগতির তথ্য অনুযায়ী, হত্যা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছিল। সে সময় চেয়ারম্যান তপনকে পলাতক হিসেবেই উল্লেখ করা হয়।
সরকারি ওয়েবপোর্টালে আবারও চেয়ারম্যান হিসেবে নাম
নতুন অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের ডুমাইন ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি ওয়েবপোর্টালে ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে হালনাগাদ করা তথ্যে শাহ আসাদুজ্জামানকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে এবং তাঁর পদবি ইউপি চেয়ারম্যান উল্লেখ করা হয়েছে।
এমনকি স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি আবারও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ফলে দুই শ্রমিক হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত হয়ে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া একজন জনপ্রতিনিধি কীভাবে আবারও দায়িত্বে ফিরলেন, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিএনপি ও কৃষক দলের নেতার বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী এবং কৃষক দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একজন নেতার সহযোগিতায় চেয়ারম্যান তপন পুনরায় দায়িত্বে ফিরেছেন। অর্থের বিনিময়ে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁকে আইনি ও প্রশাসনিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও সামনে এসেছে।
একই সঙ্গে চেয়ারম্যানের পুনর্বহালের সরকারি আদেশ, তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং হত্যা মামলার প্রধান আসামিদের বর্তমান জামিন ও বিচারিক অবস্থাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে।




