অনলাইনে প্রেমের ফাঁদে হানি ট্র্যাপ, ব্ল্যাকমেইল ও অর্থ আদায়: বাড়ছে ঝুঁকি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, প্রেম বা বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে হানি ট্র্যাপ, ব্ল্যাকমেইল, নির্যাতন ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়; তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় প্রতারণার কৌশল আরও ভয়ংকর হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছর ঢাকার জাত্রাবাড়ী ও খিলক্ষেতে পৃথক ঘটনায় পুলিশ হানি ট্র্যাপের অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। একটি ঘটনায় ভুক্তভোগীকে আপত্তিকর ভিডিও ধারণের পর ভয় দেখিয়ে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৭০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্য ঘটনায় নারীর নামে ভুয়া ফেসবুক প্রোফাইল ব্যবহার করে তরুণদের টার্গেট করার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। (The Business Standard)

অপরাধের ধরন অনেক সময় শুরু হয় খুব স্বাভাবিকভাবে।

ফেসবুকে একটি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। এরপর কয়েকটি মেসেজ। নিয়মিত কথা বলা। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আগ্রহ দেখানো। একপর্যায়ে ভিডিও কল কিংবা সরাসরি দেখা করার প্রস্তাব।

ভুক্তভোগী যখন মনে করেন, ওপাশের মানুষটি সত্যিই তার প্রতি আগ্রহী, তখনই তৈরি হতে পারে বিপদের পরিস্থিতি।

কখনো নির্দিষ্ট জায়গায় ডেকে নিয়ে আটকে রেখে মারধর ও টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। আবার কখনো ভিডিও কল বা ব্যক্তিগত মুহূর্ত রেকর্ড করে পরে তা প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি করা হয়।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে CID-এর এক মামলায় এমনই একটি অভিযোগ সামনে আসে। CID-এর তথ্য অনুযায়ী, এক ব্যক্তি ভুয়া পরিচয়ে ফেসবুকের একটি ম্যাট্রিমোনিয়াল পেজের মাধ্যমে এক নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে বিয়ের প্রতিশ্রুতি ও ভিডিও কলে সম্পর্ক তৈরি করে তার কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া এবং আপত্তিকর ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ ওঠে। CID জানিয়েছিল, ওই ঘটনায় প্রায় ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা সমপরিমাণ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। (The Daily Star)

এখানেই শেষ নয়।

ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিওকে কেন্দ্র করে ব্ল্যাকমেইল অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি মানসিক নির্যাতনে পরিণত হয়। টাকা দেওয়ার পরও অনেক ভুক্তভোগী নিরাপদ হন না; বরং নতুন করে আরও টাকা দাবি করা হতে পারে। আবার সামাজিক সম্মান, পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে নীরব রাখার চেষ্টা করা হয়।

২০২৬ সালের মার্চে ঝিনাইদহে সাবেক স্ত্রীর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর আদালত কারাগারে পাঠিয়েছে। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও ডিজিটাল কনটেন্ট কীভাবে প্রতিশোধ ও হয়রানির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। (The Daily Star)

অন্যদিকে পর্নোগ্রাফি বা প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্টের নামে পরিচালিত সন্দেহজনক গ্রুপ ও প্ল্যাটফর্মও ঝুঁকির জায়গা তৈরি করতে পারে। আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিগত ভিডিও, “প্রাইভেট গ্রুপ” কিংবা “এক্সক্লুসিভ কনটেন্ট”-এর লোভ দেখিয়ে মানুষকে অপরিচিত ব্যক্তি বা সন্দেহজনক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যোগাযোগ করানো হতে পারে। সেখান থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল বা অর্থ আদায়ের ঝুঁকি তৈরি হয়।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—কোনো নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট, অ্যাপ বা বিজ্ঞাপনকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও প্রমাণ প্রয়োজন। শুধু কোনো বিজ্ঞাপন দেখেই সেটিকে প্রতারণার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

সাইবার অপরাধের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, অপরাধী অনেক সময় ভুক্তভোগীর লজ্জা ও ভয়কে নিজের অস্ত্র বানায়।

“পরিবারকে জানিয়ে দেব।”

“ছবিগুলো ছড়িয়ে দেব।”

“অফিসে পাঠিয়ে দেব।”

“টাকা না দিলে সব প্রকাশ করে দেব।”

এই কয়েকটি বাক্যই একজন মানুষকে ভয়াবহ মানসিক চাপে ফেলে দিতে পারে।

কিন্তু বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরামর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এ ধরনের পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে প্রতারকের দাবি মেনে না নিয়ে প্রমাণ সংরক্ষণ করা এবং দ্রুত আইনগত সহায়তা নেওয়া।

ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও, OTP, পাসওয়ার্ড, NID নম্বর, ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের তথ্য অপরিচিত কারও কাছে দেওয়া উচিত নয়। সন্দেহজনক লিংকে প্রবেশ বা অচেনা ব্যক্তির পাঠানো অ্যাপ ইনস্টল করাও ঝুঁকিপূর্ণ।

আর কেউ যদি হুমকি দেয়, তাহলে চ্যাট মুছে না ফেলে স্ক্রিনশট, ফোন নম্বর, প্রোফাইল লিংক, লেনদেনের তথ্য ও অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণ করা জরুরি।

সবচেয়ে বড় কথা, ভুক্তভোগীকে দোষী হিসেবে দেখা যাবে না।

প্রতারণার শিকার হওয়া অপরাধ নয়। অপরাধ হলো বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কাউকে ফাঁদে ফেলা, ভয় দেখানো, নির্যাতন করা, ব্যক্তিগত কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া কিংবা অর্থ আদায় করা।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অন্তত একটি সতর্কবার্তা দিচ্ছে—অনলাইনে পরিচিত মানুষ মানেই পরিচিত মানুষ নয়। একটি ছবি সত্যিকারের পরিচয়ের প্রমাণ নয়। কয়েক দিনের কথোপকথনও বিশ্বাসের নিশ্চয়তা নয়।

প্রেম, বন্ধুত্ব কিংবা বিয়ের সম্পর্ক—যে কোনো ক্ষেত্রেই অনলাইনে আবেগের আগে প্রয়োজন যাচাই।

কারণ স্ক্রিনের ওপাশে একজন মানুষও থাকতে পারে, আবার একটি সাজানো ফাঁদও থাকতে পারে।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top