শার্শায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সোনামুখো বিলে ১৫ কোটি টাকার মাছ নিধন

যশোরের শার্শা উপজেলার সোনামুখো বিলে দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অক্সিজেন সংকট সৃষ্টি হয়ে প্রায় ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার মাছ মারা গেছে।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাত আনুমানিক ১টার দিকে উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের রায়পুর-সোনামুখো বিলের সজনের ঘেরে এ মাছের মড়ক শুরু হয়। শনিবার সকাল হতে না হতেই বিপুল পরিমাণ পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে পানিতে ভেসে ওঠে।

খামার মালিকদের অভিযোগ, দিন-রাতের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘন ঘন ও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হওয়ায় ঘেরে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। এর সঙ্গে বৈরী আবহাওয়া যোগ হয়ে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিপুল পরিমাণ মাছ মারা যায়। এ ঘটনায় শুধু সোনামুখো বিলের খামারিরাই নন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে উপজেলার অন্যান্য মৎস্যচাষিরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

সোনামুখো বিলের এ ঘেরটির মালিক এ এফ মৎস্য খামার। যৌথভাবে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন আলফাজুল হক ও ফারুক হোসেন। খামার মালিকদের হিসাবে, ২০০ বিঘা ঘেরে ৬০ লাখ পিস পাবদা মাছ চাষ করা হয়েছিল। প্রতি ১৫টি পাবদা মাছে প্রায় এক কেজি হিসেবে মোট উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার মণ। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ মাছের দাম প্রায় ১৫ হাজার টাকা। সে হিসাবে মাছের বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা ৫০ ল টাকা। মাছগুলো বাজারজাত ও ভারতে রপ্তানির প্রক্রিয়াও চলছিল।

খামার মালিক আলফাজুল হক বলেন, ঘেরে বিপুল পরিমাণ পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ছিল। এর বড় একটি অংশ বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু হঠাৎ দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। পরে বৈরী আবহাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, “মাছের খাদ্য বাবদ বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা বাকিতে নিয়েছি। সব মিলিয়ে আমাদের প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকার তি হয়েছে। এখন এই ঋণ কীভাবে পরিশোধ করব, কীভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াব-কিছুই বুঝতে পারছি না।”

অপর খামারি ফারুক হোসেন বলেন, “আমরা পুরোপুরি তিগ্রস্ত হয়ে গেছি। হয়তো আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব না। এই খামারের ওপর প্রত্য ও পরোভাবে প্রায় একশ পরিবার নির্ভরশীল। রাত ১টার পর থেকে বিদ্যুৎ না থাকায় অক্সিজেনের ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়ে যায়। সকাল হওয়ার আগেই বিপুল পরিমাণ পাবদা মাছ মারা যায় এবং পরে পচতে শুরু করে।”

ঘের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পানির ওপর অসংখ্য মৃত মাছ ভেসে রয়েছে। কোথাও কোথাও মাছ পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ও পরিশ্রম এক রাতের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খামার মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে।

খামার সংশ্লিষ্টরা জানান, এ খামারে উৎপাদিত পাবদা মাছের একটি অংশ রপ্তানি চেইনের মাধ্যমে ভারতে যায়। ফলে এ ধরনের মাছ চাষ শুধু স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণই করে না, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখে।

শার্শা উপজেলায় উৎপাদিত মাছ দেশের আমিষের চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে জানান স্থানীয় মৎস্যচাষি ও উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর।

তিগ্রস্থ মাছ চাষিদের অভিযোগ, মাছের মড়ক শুরু হওয়ার পর থেকে শার্শা উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর বা বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসে খোঁজখবর নেননি। তারা দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে য়তির পরিমাণ নিরূপণ এবং সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।

মাছচাষিরা বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন শুধু একটি খামারের সমস্যা নয়। গত কয়েক দিনে দিন-রাতের ২৪ ঘণ্টায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মৎস্যচাষিরাও উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে আধুনিক পদ্ধতিতে অক্সিজেন সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল বড় বড় ঘেরগুলোতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে একই ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।

স্থানীয় মৎস্যচাষিদের দাবি, বিদ্যুৎ সরবরাহে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প বিদ্যুৎ ও অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে তিগ্রস্ত খামারিদের দ্রুত য়তি নিরূপণ করে আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তারা।

এদিকে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রকৃত কারণ, কতণ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হলো এবং প্রকৃতপে কত টাকার মাছ মারা গেছে-এসব বিষয় তদন্ত করে দেখার দাবি উঠেছে।
এক রাতের বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও অক্সিজেন সংকটে নিঃস্ব হওয়ার পথে এ এফ মৎস্য খামারের দুই উদ্যোক্তা। তাদের সঙ্গে অনিশ্চয়তায় পড়েছে খামারের ওপর নির্ভরশীল প্রায় একশ পরিবার। একই সঙ্গে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে শার্শার অন্যান্য মৎস্য খামারিদের মধ্যেও।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের নিয়োগ সংবিধানসম্মত নয়: টিআইবি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছেন, টেকনোক্র্যাট কোটায় দ্বৈত নাগরিকত্বধারী পররাষ্ট্র

গলাচিপায় বসত ঘর আগুনে ভস্মিভূত

পটুয়াখালীর গলাচিপায় একটি বসত ঘর আগুনে ভস্মিভূত হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার রতনদীতালতলী ইউনিয়নের উলানিয়া বন্দরে এ অগ্নিকান্ডের ঘটনাটি ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই স্থানীয়রা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। কিন্তু ততক্ষণে উলানিয়া বন্দরের মৎস্য ব্যবসায়ী মরহুম আব্দুল খালেক বেপারীর বসত ঘরটি আগুনে ভস্মিভূত হয়ে যায়। এতে প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। বসত ঘরের দোতলায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের মাধ্যমে আগুনের সূত্রপাত বলে জানিয়েছেন গলাচিপা ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স স্টেশন অফিসার মো. জাকির হোসেন। প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. মিলন বলেন, মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উলানিয়া বন্দরে আগুনের খবর শুনে আমরা দৌড়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি মৎস্য ব্যবসায়ী মরহুম আব্দুল খালেক বেপারীর বসত ঘরটি আগুনের লেলিহান শিখায় দাউ দাউ করে জ্বলছে। ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম ঘটনাস্থলে আসার আগেই স্থানীয়রা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও শেষ রক্ষা হয়নি। কিছু আসবাবপত্র সরাতে পারলেও শেষ পর্যন্ত বসত ঘরটি সম্পূর্ণ আগুনে ভস্মিভূত হয়ে যায়। এ বিষয়ে গলাচিপা ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স স্টেশন অফিসার মো. জাকির হোসেন বলেন, আব্দুল খালেক বেপারীর বসত ঘর থেকে বৈদ্যুতিক শর্টসাকির্ট থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। এতে ২০ লাখ টাকার ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়।

Scroll to Top