রাজনীতির চাকা ঘুরে গেলে তার নির্মম প্রভাব অনেক সময় এসে পড়ে সাধারণ ও নিষ্পাপ মানুষদের ওপর। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দমন-পীড়ন আর আক্রোশের শিকার হয়ে সুনামগঞ্জের এক আলোচিত ছাত্রনেতার গোটা পরিবার আজ ধ্বংসের মুখে। ভাই ছাত্রদল বা ছাত্রলীগ—যেকোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে যুক্ত থাকুক না কেন, রক্তের সম্পর্ক আর স্নেহের বাঁধন কি কখনো অপরাধের অংশ হতে পারে? এই প্রশ্ন আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে সুনামগঞ্জের সচেতন মহলের মনে। আলোচিত সেই ছাত্রলীগ নেতা প্রিন্সের অপরাধ কেবল রাজনীতি করা। আর সেই ‘অপরাধে’ শুধু প্রিন্স একা নন তার পুরো পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুরা আজ কারাবন্দী। এর চেয়েও মর্মান্তিক বিষয় হলো প্রিন্সের আদরের ছোট বোন, ঘরের নয়নের মণি—নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া নিষ্পাপ কিশোরী সাবরিনা চৌধুরী রূপকথাকেও গ্রেপ্তার করে গাজীপুর কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে।
পরিবারে তাকে আদর করে ডাকা হতো ‘পাপিয়া’ নামে। পুরো নাম সাবরিনা চৌধুরী রূপকথা। বয়সের দিক থেকে সে সবেমাত্র কৈশোরে পা রেখেছে, পড়াশোনা করছে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীতে। যে বয়সে হাতে চকলেট, খাতা-কলম আর রঙিন স্বপ্ন থাকার কথা, সেই বয়সে তার ঠিকানা হয়েছে গাজীপুর কিশোর সংশোধনাগার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রিন্সের এই আদরের বোনটিকে ঘিরেই ছিল পুরো পরিবারের সুখের পৃথিবী। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঝড় সব ওলটপালট করে দিয়েছে। ভাইকে না পেয়ে বা পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপ্রাপ্তবয়স্ক এই কিশোরীকেও ছাড় দেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ছোট্ট পাপিয়াকেও যখন প্রিজন ভ্যানে তোলা হয় তখন আশপাশের মানুষের চোখও ভিজে উঠেছিল অশ্রুতে। রূপকথার সেই মিষ্টি হাসি আজ হারিয়ে গেছে কারাগারের রুদ্ধদ্বারে।
স্থানীয় ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, শুধু প্রিন্স বা তার ছোট বোন পাপিয়াই নয়, এই আক্রোশের শিকার হয়েছে পুরো পরিবার ও পরিজন। প্রিন্স নিজে তো বটেই, তার স্বজনদের মধ্যে শাহরুখ মামা এবং মামিও আজ কারাবন্দী। এছাড়া প্রিন্সের যে বন্ধুরা এতদিন তার ছায়া হয়ে পাশে ছিল, তাদের প্রায় সবাইকেই বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পরিবারের পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের এভাবে আটকের ঘটনায় এলাকজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রিন্সের আত্মীয়-স্বজনদের অনেকেই বলছেন, রাজনীতিতে বিরোধ থাকতে পারে কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের অজুহাতে একটি পরিবারের ওপর এমন নির্মম স্টিম রোলার চালানো অমানবিক ও নজিরবিহীন।
যেখানে পুরো পরিবার এবং বন্ধুরা আজ হয় কারাগারে, নয়তো কোণঠাসা সেখানে ব্যতিক্রম শুধু পিয়াল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে প্রিন্সের ঘনিষ্ঠ বন্ধু পিয়াল বর্তমানে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগের মধ্যে একা রাস্তায় ফেরারি জীবন কাটাচ্ছেন। কখন কার হাতে গ্রেপ্তার হতে হয় এই ভয়ে তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। যে বন্ধুদের সাথে একসময় হাসিখুশি সময় কেটেছে আড্ডা আর রাজনীতিতে মুখর ছিল চারপাশ আজ তাদের অনেকেই শ্রীঘরের অন্ধকারে আর পিয়াল বেঁচে আছেন একাকী আত্মগোপনে।
সুনামগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এখন একটাই আলোচনা—একটি পরিবারের সবাই কীভাবে রাজনৈতিক মামলায় অভিযুক্ত হতে পারে? একজন ছাত্রনেতা অপরাধ করলে তার বিচার আইন অনুযায়ী হতে পারে, কিন্তু তার অপ্রাপ্তবয়স্ক বোন, মামা-মামী বা বন্ধুদের এভাবে পাইকারি হারে গ্রেপ্তার করে কারাবন্দী করার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন যৌথ দায় বা পরিবারের সদস্যদের অপরাধী বানিয়ে দমনপীড়নের সংস্কৃতি আইনের শাসনের পরিপন্থী। বিশেষ করে নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানোর বিষয়টি শিশু অধিকারের চরম লঙ্ঘন কি না, তা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোও নড়েচড়ে বসেছে।




