অদ্য ২৪/০৮/২০২৬ রোজ সোমবার সকাল ১০ ঘটিকা খুলনার ডুমুরিয়ায় জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত দুটি খাল খনন প্রকল্পে চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার জেরে কাজ শেষ না করেই ১ কোটি ৩৬ লাখ ৩১ হাজার ১৯ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছে উপজেলা প্রশাসন।..
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বিলডাকাতিয়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকার দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন দুটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পে চরম অনিয়ম ও অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের চিত্র উঠে এসেছে। সাহস ডোলডাঙ্গা খাল থেকে ভদ্রা নদী অভিমুখে এবং কৃষ্ণনগর নিমতলা থেকে বিলডাকাতিয়া হয়ে রংপুর সাড়াতলা পর্যন্ত খাল পুনঃখননের জন্য বিশাল অংকের বাজেট বরাদ্দ করা হলেও প্রকল্পের বাস্তবায়ন ছিল অত্যন্ত দায়সারা। প্রকল্প দুটির প্রাক্কলিত ব্যয়ের বিপরীতে কাজের গুণগত মান বজায় না রাখা এবং খননকাজে ব্যাপক গাফিলতির কারণে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে কাজের মান ও কৌশলে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করার পর টনক নড়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের। মূলত ৫ থেকে ৭ ফুট গভীরতা সম্পন্ন খাল খননের নামে ভেক্যু মেশিন দিয়ে তড়িঘড়ি করে মাটি তুলে খালের পাড়েই স্তূপ করে রাখা হয়, যা পরবর্তীতে বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে পুনরায় খালে বিলীন হয়ে যায়। প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে সরকারি অর্থের এমন অপচয় ও অস্বচ্ছতা শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক চাপে অর্থ ফেরতের মাধ্যমে নথিবদ্ধ হয়েছে।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, খাতা-কলমে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে খালগুলোর গভীরতা বা প্রশস্ততায় কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। বিশেষ করে ভদ্রা নদীর স্লুইজ গেটের সামনে নামমাত্র একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, যার অস্তিত্বও এখন হুমকির মুখে। প্রকল্প এলাকায় রোপণ করা চারাগাছগুলো বর্তমানে পানির নিচে তলিয়ে আছে, যা প্রকল্পের অপরিকল্পিত নকশারই বহিঃপ্রকাশ। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্যমতে, খাল খননের নামে যে মাটি তোলা হয়েছিল, তার অধিকাংশই এখন বিলীন হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি মেলেনি। বিলডাকাতিয়ার মতো এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘ সময় ধরে এই জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে ফসলি জমি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, অথচ সরকারি প্রকল্পের নামে কেবল অর্থ লোপাটের মহোৎসব চালানো হয়েছে। খননকাজে ব্যবহৃত মাটির অধিকাংশের অস্তিত্ব না থাকায় প্রকল্পের সুফল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে হাজারো সাধারণ মানুষ, যা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এ বিষয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ আরিফ হোসেন জানান, প্রকল্পের অব্যয়িত ১ কোটি ৩৬ লাখ ৩১ হাজার ১৯ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে, তবে এর বাইরে বিস্তারিত তথ্যে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সবিতা সরকার অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ব্যস্ততার অজুহাতে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এদিকে খুলনা জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল করিম জানান, সরেজমিনে কাজের মান ও পরিমাণ যাচাই করার পর জেলা প্রশাসকের কঠোর নির্দেশনায় অবশিষ্ট অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর এমন দায়সারা বক্তব্য ও সমন্বহীনতা প্রমাণ করে যে, প্রকল্পের প্রাক্কলন ও বাস্তবায়নের মধ্যে কোনো ধরনের স্বচ্ছতা ছিল না, যা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ নজরদারির ব্যর্থতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
খাল খনন প্রকল্পের এই ব্যর্থতা কেবল সরকারি অর্থের অপচয় নয়, বরং এটি ডুমুরিয়ার কৃষি ও জনজীবনকে আরও দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বাস্তবায়নকারী দপ্তরের এই অদূরদর্শিতার কারণে জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল লক্ষ্যই ব্যাহত হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আসন্ন বর্ষা মৌসুমেও। প্রকল্পের অর্থ ফেরত দেওয়া হলেও স্থানীয় মানুষের ভোগান্তির কোনো সুরাহা হয়নি, বরং সরকারি তহবিলের অপচয় রোধে প্রয়োজনীয় জবাবদিহিতার অভাব জনমনে এক গভীর আস্থার সংকটের সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে না পারলে ডুমুরিয়ার মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোতে জনদুর্ভোগ কেবল দীর্ঘায়িতই হবে, যা প্রশাসনিক ব্যর্থতার একটি করুণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।




