চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান আসবাবপত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ, থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের এবং পরবর্তী সময়ে আদালতে মামলা হওয়ার ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন স্বামী এনামুল হক। পাশাপাশি অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তা আনোয়ারা থানার এসআই ইমামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফল যাচাই করা জরুরি।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
অভিযোগকারী এনামুল হকের দাবি, গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তাঁর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস নগদ ১ লাখ ৫ হাজার টাকা, স্বর্ণালংকার ও বিভিন্ন মূল্যবান আসবাবপত্র নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে তিনি গত ২৪ সেপ্টেম্বর আনোয়ারা থানায় লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন বলে জানান।
এনামুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগটি তদন্তের দায়িত্ব পান থানার এসআই ইমাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তদন্তের প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর মনে সন্দেহ তৈরি হয়।
তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গোপন যোগাযোগের অভিযোগ
এনামুল হকের অভিযোগ, তাঁর অগোচরে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ইমাম তাঁর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তাঁর আরও দাবি, ওই কর্মকর্তার পরামর্শ এবং স্ত্রীর পরিবারের সহযোগিতায় তাঁকে ডিভোর্স দেওয়া হয়।
তবে এসব অভিযোগের সমর্থনে কী ধরনের নথি বা প্রমাণ রয়েছে, তা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিস্তারিত বক্তব্যও প্রয়োজন।
থানায় গিয়ে কী জানতে পারেন এনামুল হক?
এনামুল হক জানান, গত ৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে তিনি আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুনায়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ইমামের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি লিখিত অভিযোগের কপি তাঁর কাছে নেই বলে জানান—এমন দাবি করেন এনামুল হক।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় এসআই ইমামের মোবাইল ফোন থেকে জান্নাতুল ফেরদৌসকে কল করা হয়। এ ঘটনায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
তবে লিখিত অভিযোগের কপি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে না থাকার কারণ, অভিযোগটি থানার নথিতে কীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে এবং তদন্তের অগ্রগতি কী ছিল—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
পরদিন আদালতে মামলা, উঠেছে পাল্টা অভিযোগ
এনামুল হকের দাবি, গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে জান্নাতুল ফেরদৌস তাঁর বিরুদ্ধে বিজ্ঞ আদালতে মামলা করেন। তিনি মামলাটিকে হয়রানিমূলক বলে অভিযোগ করেছেন।
তবে আদালতে দায়ের করা মামলার নথি, মামলার প্রকৃতি এবং অভিযোগের বিবরণ পর্যালোচনা না করে সেটিকে মিথ্যা মামলা হিসেবে চূড়ান্তভাবে আখ্যায়িত করা যায় না। একইভাবে, এ মামলার সঙ্গে এসআই ইমামের কোনো অনিয়ম বা সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
থানার সেবা নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন
এনামুল হক ও কয়েকজন স্থানীয়ের অভিযোগ, প্রতিকার চাইতে থানায় গিয়ে কোনো কোনো বিচারপ্রার্থী ভোগান্তির মুখে পড়েন। তাঁদের দাবি, তদন্তের ক্ষেত্রে পক্ষপাতমূলক আচরণ হলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়ে আস্থা হারাতে পারেন।
অন্যদিকে, স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিচারপ্রার্থীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন এবং পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেন। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে তাঁদের অসন্তোষ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও স্বাধীন যাচাই ছাড়া সামগ্রিকভাবে পুলিশ প্রশাসন সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
এসআই ইমাম কী বলছেন?
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ইমাম বলেন, এনামুল হকের লিখিত অভিযোগের কাগজ তিনি পাননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জান্নাতুল ফেরদৌস থানায় আসার কথা থাকলেও তিনি আসেননি।
তবে এনামুল হকের উত্থাপিত অন্যান্য অভিযোগ সম্পর্কে এসআই ইমামের বিস্তারিত বক্তব্য এবং জান্নাতুল ফেরদৌসের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আরও পূর্ণাঙ্গ হবে।
অনুসন্ধানে যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি
ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন—
১. গত ২৪ সেপ্টেম্বর থানায় লিখিত অভিযোগ দাখিলের প্রমাণ ও থানার নথিতে তার অবস্থান কী?
২. অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব কবে এবং কীভাবে এসআই ইমামকে দেওয়া হয়েছিল?
৩. তদন্ত চলাকালে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হয়েছিল কি না?
৪. গত ৫ অক্টোবর আদালতে দায়ের করা মামলার প্রকৃত অভিযোগ কী এবং তার সঙ্গে আগের বিরোধের সম্পর্ক কী?
৫. তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য নথি, সাক্ষ্য বা প্রমাণ রয়েছে কি না?
উপসংহার
আনোয়ারার এ ঘটনায় একদিকে স্বামীর অভিযোগ, অন্যদিকে আদালতে মামলা দায়েরের বিষয়টি সামনে এসেছে। একই সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে থানার নথিপত্র, আদালতের মামলা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং প্রাসঙ্গিক প্রমাণ যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির বক্তব্য শোনা এবং তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়াও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অপরিহার্য অংশ।
প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্ব: সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, জান্নাতুল ফেরদৌসের বক্তব্য এবং থানা কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ ও যাচাই করা গেলে অনুসন্ধানের পরবর্তী তথ্য প্রকাশ করা হবে।




