কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার মো. মাহফুজার রহমানের বিরুদ্ধে জমির কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই না করে দলিল সম্পাদন, ঘুষ গ্রহণ ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেছেন ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের মৃত জামাল উদ্দিন শিকদারের ছেলে মো. মিজানুর রহমান শিকদার এবং পশ্চিম ছাট গোপালপুর গ্রামের মৃত মজিবর রহমানের ছেলে মো. তোরাফ আলী।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ৮৭৭/২৬, ৮৭৮/২৬ ও ৮৭৯/২৬ নম্বরের তিনটি দলিল সম্পাদন করা হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ২০২৪ সালে ৩৯৭৪/৯২ ও ৩৫৯৪/০৫ নম্বর দলিলের সূত্রে ৪৩৪০৮১৩ নম্বর নামজারি আবেদনের মাধ্যমে ৭৫৬০ দাগে তোরাফ আলী ও মাজেদা খাতুনের নামে ১৬ শতক জমির ২১৬৪ নম্বর খতিয়ান প্রস্তুত হয়। একইভাবে, ২০২৫ সালে ৩৯৭৪/৯২ নম্বর দলিলের সূত্রে ৪৫০৬০৫২ নম্বর নামজারি আবেদনের মাধ্যমে ১২ জন ওয়ারিশের নামে ৩২ শতক জমির ২৫-২১৭৫ নম্বর খতিয়ান প্রস্তুত করা হয়।
তাঁদের দাবি, এসব জমি তাঁরা ভোগদখল করে আসছেন এবং নিয়মিত খাজনা দিয়েছেন। কিন্তু জমির রেকর্ড, নামজারি, দখল ও খাজনার কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই না করে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে দলিলগুলো নিবন্ধন করা হয়েছে। এ ঘটনায় সাব-রেজিস্ট্রার মো. মাহফুজার রহমান ও দলিল লেখক মো. রেজাউল করিমের (লাইসেন্স নম্বর ৭৩) বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী মিজানুর রহমান শিকদার বলেন, তাঁর মা আর.এস. ৭০৬ রেকর্ডের মালিক কুমর উদ্দিনের ছেলে গাছিউরের কাছ থেকে ৪৮ শতক জমি কেনেন। পরে অর্থের প্রয়োজনে তোরাফ আলীর কাছে ১৬ শতক বিক্রি করেন। জমিটি তাঁরা ভোগদখল করে আসছেন। তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর ওয়ারিশদের নামে নামজারি করা হয় এবং খাজনা পরিশোধের কাগজপত্রও রয়েছে।
মিজানুর রহমান বলেন, গত সেপ্টেম্বরে শহিদুলের ছেলে মনির গং ভূরুঙ্গামারী সিভিল জজ আদালতে ১১২/২৬ নম্বর মামলা করলে বিষয়টি জানতে পারেন। পরে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সংগ্রহ করে তিনটি দলিল সম্পাদনের তথ্য পান। তাঁর আশঙ্কা, এ ঘটনায় জমি নিয়ে বিরোধ আরও বাড়তে পারে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। তিনি নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
তোরাফ আলী বলেন, তিনি মিজানুর রহমান শিকদারের মায়ের কাছ থেকে ৪৮ শতক জমির মধ্যে ১৬ শতক কিনে ভোগদখল করছেন। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী পক্ষ মনির ও মজিদ গং ভুয়া আমমোক্তারনামার মাধ্যমে দলিল করেছেন।
তবে মনির বলেন, তাঁরা ১৯৯২ সালে গাজিউর রহমানের কাছ থেকে ৮১ শতক জমি কিনেছিলেন। পরে জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে এসএ ও সিএস রেকর্ডের মালিকের ওয়ারিশদের খুঁজে পান। তাঁদের কাছ থেকে আমমোক্তারনামার ভিত্তিতে ২০২৬ সালে তিনটি দলিলের মাধ্যমে ৯৫ শতক জমি কোরআন শরিফ, তসবি ও জায়নামাজের বিনিময়ে লিখে নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, এ পর্যন্ত কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। মামলার রায় ও জমির হিসাব-নিকাশের পর লেনদেনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
মনিরের দাবি, তাঁরা বর্তমানে ৯৫ শতক জমি ভোগদখল করছেন। তোরাফ আলী মিজান শিকদারদের কাছ থেকে জমি কিনে থাকলেও, তোরাফের দখলে থাকা ১৬ শতক জমিতে তাঁদের দাবি নেই। তবে মিজান ওই জমি পাবেন না বলে তিনি জানান।
এদিকে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতি টিপসইয়ের জন্য ১৫০ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এ টাকা অফিসকক্ষেই নেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের তথ্যসূত্রের দাবি, সংগৃহীত অর্থ থেকে প্রতি মাসে কোর্ট মসজিদে ৮ হাজার, থানা মসজিদে ৫ হাজার, একটি কেজি স্কুলে ৩ হাজার এবং একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসায় ৩ হাজার টাকা দেওয়া হয়। বাকি টাকা কর্মচারীরা ভাগ করে নেন। ওই সূত্রের দাবি, গত মাসেও এ অর্থ দেওয়া হয়েছে। তবে এ অর্থ গ্রহণ ও বিতরণের কোনো নিয়ম নেই বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এ ছাড়া, কিছু দলিল লেখকের বিরুদ্ধে ভুয়া খতিয়ান, নামজারি ও খাজনার কাগজপত্র তৈরি করে জাল স্বাক্ষর ও সিল ব্যবহার করে জমি নিবন্ধন করানোর অভিযোগ রয়েছে। কিউআর কোডের মাধ্যমে কাগজপত্র যাচাইয়ের সুযোগ থাকলেও, অর্থের বিনিময়ে ভুয়া কাগজপত্রের ভিত্তিতে দলিল সম্পাদনের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দলিল লেখক মো. রেজাউল করিম বলেন, ওই জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। তাঁর দাবি, সঠিক কাগজপত্র দিয়েই দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে। অভিযোগের তদন্তের জন্য তাঁরা কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। অভিযোগকারীদের জমিতে দখল নেই দাবি করে তিনি বলেন, মিথ্যা অভিযোগ করায় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।
সাব-রেজিস্ট্রার মো. মাহফুজার রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, যাঁরা জমি ভোগদখলে আছেন, তাঁরাই দলিল করেছেন। অভিযোগকারীদের নামে নামজারি থাকলেও জমিতে তাঁদের দখল নেই। তাঁর দাবি, মূল মালিকরা সরকারের কাছ থেকে বয়নামা দলিলের মাধ্যমে জমি পেলেও পরে একটি জাল দলিলের ভিত্তিতে বিএস রেকর্ড তৈরি করা হয়। অভিযোগকারীরা ওই রেকর্ডের মালিকের কাছ থেকে জমি কেনেন। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান মালিকেরা মামলা-জটিলতা এড়াতে ‘না-দাবি দলিল’ করেছেন। তবে বিষয়টি আগে জানলে তিনি দলিল নিবন্ধন করতেন না। অনলাইনে দলিল সম্পাদনের প্রক্রিয়া চালু হলে এসব জটিলতা কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মামলা চলমান থাকলেও দলিল নিবন্ধন করা যায় উল্লেখ করে মাহফুজার রহমান বলেন, মামলার সঙ্গে নিবন্ধনের সরাসরি সম্পর্ক নেই। তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় ও আইজিআর কার্যালয় তদন্ত করবে; সেখানে তিনি নিজের বক্তব্য দেবেন। প্রতি টিপসইয়ের জন্য ১৫০ টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এ টাকা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ টাকা নেওয়া এখনো চলছে।
অভিযোগকারীদের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের নামজারির সময় দায়িত্বে থাকা তৎকালীন ভূমি কর্মকর্তা তাহমিদুলের কাছে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে নামজারি |




