ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে নিজস্ব অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও ইরানকে ৯০টি সর্বাধুনিক গাইডেড মিসাইল লাঞ্চার সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে রাশিয়া। রাশিয়ার একটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের গোপন উৎপাদন নথির বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
হেলিকপ্টারে ব্যবহারযোগ্য এসব লাঞ্চার সরবরাহের চুক্তিটি প্রমাণ করে যে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে মস্কো ও তেহরানের সামরিক জোট কীভাবে আরও শক্তিশালী হয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে রাশিয়া ‘খুবই সামান্য বা কিছুই করছে না’। তবে পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর মস্কো ও তেহরানের মধ্যকার কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর হয়েছে।
এর আগেও ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল যে ইরানকে সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করেছে রাশিয়া। এছাড়া তেহরানের কাছে কাঁধে রেখে নিক্ষেপযোগ্য ‘ভেরবা’ বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করা এবং পরমাণু অস্ত্রসংক্রান্ত স্পর্শকাতর প্রযুক্তি ও তথ্যের বিনিময়েও যুক্ত রয়েছে মস্কো।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর গবেষক নিকোল গ্রাজিউস্কি বলেন, ‘নিজস্ব যুদ্ধের চাপ থাকা সত্ত্বেও ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ চালিয়ে যেতে রাশিয়ার যে স্পষ্ট আগ্রহ রয়েছে, এই চুক্তি তারই প্রমাণ। পশ্চিমা বিশ্বের আপত্তির বিষয়ে আগের চেয়ে এখন অনেকটাই কম চিন্তা করছে মস্কো।’
ইউক্রেনীয় বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থা ‘ডালাস অ্যানালিটিক্স’-এর হাতে আসা নথিটি ২০২৪ সালের মে মাসে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও লাঞ্চার প্রস্তুতকারক প্রধান প্রতিষ্ঠান ‘ভিমপেল’ থেকে দেশটির আরেক প্রতিরক্ষা সংস্থা ‘কেবিএম’-এর কাছে পাঠানো হয়েছিল। চিঠিতে ভিমপেল মূলত হেলিকপ্টারে ব্যবহারযোগ্য ‘এপিইউ-এল’ এবং ‘এপিইউ-৩০৫’ নামের দুটি লাঞ্চারের যন্ত্রাংশ দ্রুত সরবরাহের তাগিদ দেয়। নির্দিষ্ট সময়ে যন্ত্রাংশ না পেলে তাদের ৯টি সামরিক রপ্তানি চুক্তি ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্ক করা হয়।
ওই নথির সংযোজিত উৎপাদন তালিকায় সাতটি রুশ সামরিক ক্রেতার পাশাপাশি দুটি বিদেশি রাষ্ট্রের নাম উল্লেখ রয়েছে। একটি ক্রেতা হিসেবে সরাসরি চীনের নাম লেখা হয়েছে, যার জন্য ১৯২টি এপিইউ-৩০৫ লাঞ্চার তৈরির কথা বলা হয়। অন্যদিকে ৯০টি এপিইউ-এল লাঞ্চারের বরাত দেয়া দ্বিতীয় বিদেশি ক্রেতাটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে কেবল একটি গোপন কোড নামে—‘কে-১০’।
অভ্যন্তরীণ রুশ সামরিক নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে জানা গেছে, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানি সংস্থা ‘রোসোবোরোনেক্সপোর্ট’ মূলত ইরানকে নির্দেশ করতে কোড নাম ‘কে-১০’ ব্যবহার করে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের হাতে আসা রুশ বিমান প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের অন্য নথিতেও ইরানের জন্য বরাদ্দ প্রশিক্ষণ ও হালকা যুদ্ধবিমান ‘ইয়াক-১৩০’-এর ক্ষেত্রে ‘কে-১০, ইরান’ কোড ব্যবহার করতে দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপ্রির (ঝওচজও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষের দিকে এসব বিমানের পুরো চালানই ইরানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তবে চুক্তির আওতায় ৯০টি লাঞ্চার শেষ পর্যন্ত ইরানের হাতে পৌঁছেছে কি না, তা ওই নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
উভয় ধরনের লাঞ্চারই মূলত রাশিয়ার হালকা বহুমুখী গাইডেড মিসাইল ‘এলএমইউআর’ বা ‘ইজদেলিয়ে ৩০৫’ বহনে সক্ষম। এটি অত্যন্ত নির্ভুল দূরনিয়ন্ত্রিত অস্ত্র, যা সুনির্দিষ্ট গতিশীল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এটি প্রথম ২০২১ সালে প্রদর্শিত হয় এবং ২০২২ সালে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত হওয়ার পর ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ডালাস অ্যানালিটিক্সের এক প্রতিনিধি জানান, এই ক্ষেপণাস্ত্র ড্রনের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুতগতির। এটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২ ৩০ মিটার বেগে ছোটে এবং মাত্র এক মিনিটে ১৪ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে। চালক দূর থেকে এটি নিয়ন্ত্রণ করে ছোট ও চলমান লক্ষ্যবস্তুতে সুনির্দিষ্টভাবে আঘাত করতে পারেন। দ্রুত আক্রমণ চালিয়ে প্রতিপক্ষের পাল্টা আঘাতের আগেই নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার (শুট-অ্যান্ড-স্কুট) কৌশলে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
মার্কিন সেনাবাহিনীর সরঞ্জাম সংক্রান্ত নির্দেশিকা অনুযায়ী, এপিইউ-এল লাঞ্চারগুলো মূলত রাশিয়ার মি-২৮ অ্যাটাক হেলিকপ্টারের জন্য তৈরি। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীতে এ ধরনের মি-২৮ হেলিকপ্টার ইতিমধ্যে যুক্ত হতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তেহরানের একটি সামরিক হ্যাঙ্গারে রুশ মি-২৮ হেলিকপ্টারের উপস্থিতি ওপেন সোর্স অনুসন্ধানেও নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে রাশিয়া কিছুটা সতর্ক ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের ইউরেশিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক হ্যানা নটে বলেন, ‘এই সংঘাতের ক্ষেত্রে রাশিয়ার এখনো নির্দিষ্ট কিছু লাল সীমা রয়েছে। সে কারণেই ইরানকে দেয়া তাদের সামরিক সহায়তা কার্যক্ষমতার দিক থেকে সহায়ক হলেও, তা পুরো যুদ্ধের চিত্র একবারে বদলে দেয়ার মতো নয়।’



