যশোরের কেশবপুরে দিন দিন বাড়ছে বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমানের সংখ্যা। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়ছে না তাদের খাদ্যের জোগান। ফলে খাদ্য সংকটে পড়ে হনুমানগুলো এখন লোকালয়, বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হানা দিচ্ছে। খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে অনেক হনুমান বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে, আবার কেউ কেউ আহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে হনুমানের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।স্থানীয়দের ধারণা, বর্তমানে কেশবপুরে চার শতাধিক হনুমান রয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল আনুমানিক ২৫০ থেকে ৩০০। তবে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে হনুমান গণনা করা হয়নি। ফলে প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। বর্তমানে কেশবপুর ও পাশের মণিরামপুর উপজেলার অন্তত ১২টি এলাকায় এসব হনুমানের বিচরণ দেখা যাচ্ছে।বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন হনুমানের জন্য ৪৭ কেজি ২০০ গ্রাম কলা, ৬ কেজি ৭০০ গ্রাম পাউরুটি, ৭ কেজি ৩৫০ গ্রাম বাদাম ও ৭ কেজি সবজি সরবরাহ করা হয়। তবে এই খাদ্য নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে থাকা সব হনুমানের কাছে খাবার পৌঁছাচ্ছে না।খাদ্য সরবরাহকারী ভ্যানচালক আতিয়ার রহমান বলেন, “উপজেলা সদর, হাসপাতাল, বালিয়াডাঙ্গা, ক্ষতিয়াখালী, মাগুরাডাঙ্গা ও বাঁকাবর্শী-নতুনহাট এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও নিয়মিত খাদ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয় না।”
আদিকাল থেকেই কেশবপুরের ভোগতী, বালিয়াডাঙ্গা, মধ্যকুল, খতিয়াখালী, সুজাপুর, ব্রহ্মকাটি, আলতাপোল, বায়সা, রামচন্দ্রপুর ও মাগুরাডাঙ্গা এলাকায় হনুমানের বিচরণ রয়েছে। পাশাপাশি মণিরামপুর উপজেলার মুজগুন্নী ও দুর্গাপুর এলাকাতেও তাদের দেখা যায়। তবে এসব এলাকায় বনজ সম্পদ কমে যাওয়ায় হনুমানগুলো কেশবপুরের বাইরেও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে এসব এলাকায় হনুমানের উপস্থিতি বেড়েছে।খাদ্যের অভাবে হনুমানগুলো এখন মানুষের বসতবাড়ি ও দোকানপাটে ঢুকে পড়ছে। খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে দুর্ঘটনার শিকারও হচ্ছে তারা। সম্প্রতি কেশবপুর শহরের ত্রিমোহিনী মোড়ে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে আহত একটি হনুমান চিকিৎসার জন্য মানুষের সাহায্য চায়। স্থানীয় সংবাদকর্মী আব্দুর রহমান কাছে যেতেই হনুমানটি তার কাঁধে উঠে বসে। পরে তিনি দ্রুত পাশের একটি ফার্মেসিতে নিয়ে হনুমানটির চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার সৃষ্টি করে। তাদের মতে, সঠিকভাবে হনুমান গণনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করা হলে এমন পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।কেশবপুর শহরের সাহাপাড়ার খ্রিস্টান মিশনের পাশের এক মুদি দোকানদার বিশ্বজিৎ বলেন, “সম্প্রতি আমাদের এলাকায় হনুমানের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। প্রায়ই দোকান থেকে বিস্কুট, পটেটো চিপস ও বাজারের প্যাকেট নিয়ে যায়। আগের তুলনায় অনেক বেশি হনুমান এসেছে। পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে তারা দোকানেও হানা দিচ্ছে।স্থানীয়দের দাবি, শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে খাবার সরবরাহ না করে হনুমানের বিচরণস্থল ও সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে খাদ্য বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের নিরাপদ আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস নিশ্চিত করাও জরুরি।
উপজেলা বন বিভাগের কর্মকর্তা সমীরণ বিশ্বাস জানান, সম্প্রতি কেশবপুরে হনুমানের সংখ্যা বেড়েছে। তার ধারণা, বর্তমানে উপজেলায় চার শতাধিক হনুমান রয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে গণনা করা হলে তাদের সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব হবে।এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, “উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় হনুমান ছড়িয়ে পড়ছে। উপজেলায় বা বিভিন্ন গবেষণা দলের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে হনুমানদের খাবারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনে উদ্যোগ নেওয়া হবে।”স্থানীয়দের মতে, কেশবপুরের কালোমুখো হনুমান শুধু এলাকার জীববৈচিত্র্যের অংশ নয়, এটি এ অঞ্চলের ঐতিহ্যেরও পরিচায়ক। এসব হনুমান দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা কেশবপুরে আসেন। তাই তাদের অস্তিত্ব রক্ষা ও নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে দ্রুত আনুষ্ঠানিক গণনা, পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।




