আজ ১৯ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী
নিজস্ব প্রতিবেদক | কিশোরগঞ্জ
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুর গ্রামের কৃতী সন্তান, বিশিষ্ট শিল্পপতি, উদ্যোক্তা, সমাজসেবক ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক আলহাজ্ব জহুরুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী আজ ১৯ অক্টোবর। বাংলাদেশের শিল্পায়ন, আবাসন, নির্মাণ, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় তাঁর অবদান তাঁকে দেশের ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে।
১৯২৮ সালের ১ আগস্ট ভাগলপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম। তাঁর পিতা আলহাজ্ব আফতাব উদ্দিন আহমেদ এবং মাতা রহিমা আক্তার খাতুন। শৈশবে সরারচর ও বাজিতপুরে পড়াশোনা শেষে তিনি কলকাতার রিপন হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করতে না পারলেও কঠোর পরিশ্রম, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন দেশের অন্যতম সফল শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে।
১৯৪৮ সালে তৎকালীন সরকারের সিঅ্যান্ডবি (C&B) বিভাগে স্বল্প বেতনে চাকরির মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৫১ সালে চাকরি ছেড়ে ঠিকাদারি ব্যবসায় যুক্ত হন। নিষ্ঠা, দক্ষতা ও সময়ানুবর্তিতার মাধ্যমে অল্প সময়েই তিনি ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করেন। ১৯৫৩ সালের মধ্যে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন তিনি। পরবর্তীতে তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠে ইসলাম গ্রুপ, যা বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসায়িক খাতে বিস্তৃত হয়।
আবাসন ও নির্মাণশিল্পে পথিকৃৎ
বাংলাদেশের আধুনিক আবাসন খাতের বিকাশে আলহাজ্ব জহুরুল ইসলামের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৪ সালে তিনি ইস্টার্ন হাউজিং প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকার উন্নয়ন এবং নির্মাণশিল্পের সম্প্রসারণে তাঁর প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আবাসন, বাণিজ্যিক ভবন ও বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পে তাঁর উদ্যোগ দেশের নগরায়ণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে অবদান রাখে। তাঁর ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা বাংলাদেশের আবাসন খাতের বিকাশে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে।
শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে অবদান
আলহাজ্ব জহুরুল ইসলামের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড আবাসন ও নির্মাণশিল্পে সীমাবদ্ধ ছিল না। কৃষি, পোলট্রি, ডেইরি, খাদ্য উৎপাদন, ওষুধশিল্প, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য খাতে তাঁর উদ্যোগ বিস্তৃত হয়। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে তিনি ভূমিকা রাখেন।
স্বাধীনতার পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও তাঁর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হয়। আবুধাবি, ইরাক ও ইয়েমেনে নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন প্রকাশনায় উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে এসব উদ্যোগ বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা তুলে ধরতে সহায়তা করে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান
আলহাজ্ব জহুরুল ইসলামের জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হলো মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাঁর সমর্থন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে, ১৯৭১ সালে তিনি লন্ডনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করা ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা দেন। ‘সুবেদ আলী’ ছদ্মনামে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অর্থ জোগানের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথাও বিভিন্ন লেখায় উঠে এসেছে।
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর এই ভূমিকা তাঁর জীবনকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে।
জন্মভূমিতে শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার অবকাঠামো
নিজের জন্মভূমি ভাগলপুর ও বাজিতপুর অঞ্চলের মানুষের জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার সুযোগ সৃষ্টি ছিল তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এ অঞ্চলের চিকিৎসাসেবা ও চিকিৎসাশিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি নার্সিং শিক্ষা এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণেও তাঁর উদ্যোগ অবদান রেখেছে।
১৯৮৯ সালে তাঁর উদ্যোগে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়। পরবর্তীকালে চিকিৎসাশিক্ষার কার্যক্রম যুক্ত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি আরও বিস্তৃত পরিসরে বিকশিত হয়। রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসাসেবার বাইরে নিজ এলাকায় উন্নত চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টির এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত।
সমাজসেবা ও মানবিক উদ্যোগ
শিক্ষা, চিকিৎসা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টাও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে এলাকার মানুষের জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
একজন উদ্যোক্তার সাফল্য শুধু তাঁর সম্পদ বা প্রতিষ্ঠানের আকার দিয়ে বিচার করা যায় না; বরং সমাজের জন্য তিনি কতটা স্থায়ী অবদান রেখে গেছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আলহাজ্ব জহুরুল ইসলামের জীবন ও কর্ম সেই উপলব্ধিকে সামনে নিয়ে আসে।
মৃত্যু ও অমর উত্তরাধিকার
১৯৯৫ সালের ১৯ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৬৭ বছর। তাঁর কর্ম ও অবদানের স্মৃতি আজও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে স্মরণীয়।
শিল্প, আবাসন, নির্মাণ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে তাঁর অবদান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। বিশেষ করে জন্মভূমি ভাগলপুরে শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি স্থানীয় মানুষের কল্যাণে স্থায়ী অবদান রেখে গেছেন।
আলহাজ্ব জহুরুল ইসলামের জীবন নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী ও সমাজসেবীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। সীমিত সুযোগ থেকে শুরু করে পরিশ্রম, সাহস ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে সাফল্য অর্জন এবং সেই সাফল্যকে জনকল্যাণে কাজে লাগানোর যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে এই কৃতী সন্তানকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর নেক আমলগুলো কবুল করুন, ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।




