মৌলিক ভাবনা স্বকীয় ভাষা এবং শিকড়সন্ধানী সাহিত্যসাধনা একজন মানুষকে কীভাবে ধাপে ধাপে জাতীয় সাহিত্যের মূলধারায় স্থান করে দিতে পারে, তার এক অনন্য ও বাস্তব উদাহরণ কবি ও ঔপন্যাসিক মোঃ হাবিবুল্লাহ হেলালী। হাওর, নদী আর পাহাড়ের রূপবৈচিত্র্যে ঘেরা সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার এক নিভৃত ও ঐতিহ্যবাহী গ্রাম লামাসানিয়া। ১৯৮৮ সালের ১ জানুয়ারি এই সবুজ-শ্যামল গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা মোঃ আব্দুল হান্নান এবং মাতা মোছাঃ রুকিয়া বেগম। শৈশব থেকেই হাওরাঞ্চলের লোকজ জীবনধারা প্রকৃতির রূপবদল এবং মানুষের নিরন্তর জীবনসংগ্রাম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। আর এই গভীর পর্যবেক্ষণই পরবর্তীতে তাঁর ভেতরে জন্ম দিয়েছে এক অনন্য সাহিত্যিক সত্তার।
পেশাগত জীবনে মোঃ হাবিবুল্লাহ হেলালী একজন নিবেদিতপ্রাণ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিক। সমাজের সত্য ও অন্যায়ের চিত্র বস্তুনিষ্ঠভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরাই তাঁর পেশাগত দায়িত্ব। তবে সাংবাদিকতার ব্যস্ত জীবন ও কঠিন বাস্তবতার ভেতরেও তাঁর মূল চালিকাশক্তি ও প্রাণের স্পন্দন হলো সাহিত্যচর্চা। তিনি মূলত কবি ও ঔপন্যাসিক হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেছেন এবং লেখালেখিকেই জীবনের প্রধান ব্রত ও ধ্যানজ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
একজন নবীন লেখক থেকে আজকের পরিচিত ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠার গল্পটি মোটেও সহজ ছিল না। হাবিবুল্লাহ হেলালীর এই সাহিত্যিক যাত্রার প্রারম্ভিক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ‘ছোটোকাগজ’ বা লিটল ম্যাগাজিনের আঙিনায়। বাংলা সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা অসামান্য। মূলধারার বাণিজ্যিক সাহিত্য সাময়িকীগুলোতে যখন নবীন ও উদীয়মান লেখকদের প্রকাশের সুযোগ থাকে অত্যন্ত সীমিত, ঠিক তখনই লিটল ম্যাগাজিন নবীনদের কাঁচা কিন্তু অত্যন্ত মৌলিক লেখনীকে পরম যত্নে ধারণ করে। হাবিবুল্লাহ হেলালীও তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সূচনায় এই ছোটোকাগজকেই বেছে নিয়েছিলেন। লিটল ম্যাগাজিনের বাণিজ্যিকতাহীন ও স্বাধীন মুক্তাঙ্গনে চর্চিত ভাবনাই পরবর্তীতে তাঁর লেখায় এনে দিয়েছে গভীর পরিপক্বতা এবং তাঁকে পাঠকদের কাছে এক স্বকীয় পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্বসাহিত্যের মতো আমাদের দেশের বহু প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় লেখকের আত্মপ্রকাশ যেমন ছোটোকাগজের হাত ধরে হয়েছিল, হাবিবুল্লাহ হেলালীও ঠিক সেই ধারারই এক সার্থক অনুসারী।
দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে হাবিবুল্লাহ হেলালী পাঠকদের উপহার দিয়েছেন অসংখ্য কবিতা ও উপন্যাস। তাঁর রচিত প্রতিটি গ্রন্থই পাঠকমহলে বেশ সমাদৃত এবং জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছে। তবে তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও মাইলফলক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে বাঁশতলার তৃতীয় সংখ্যা গ্রন্থটি। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং বীরত্বগাথার এক অনন্য প্রামাণ্য রূপ এই বই। বাঁশতলা কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয় এটি একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের এক অবিস্মরণীয় ও রক্তস্নাত অধ্যায়। লেখক হাবিবুল্লাহ হেলালী তাঁর এই গ্রন্থে উক্ত অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ চেতনা, মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ এবং স্থানীয় মানুষের নির্মম আত্মত্যাগকে অত্যন্ত আবেগঘন ও সাবলীল কাব্যিক ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এই বইটি কেবল এক অনন্য সাহিত্যকর্মই নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সুরক্ষায় এক ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে পাঠকমহলে।
হাওরাঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতি গ্রামীণ মানুষের প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখ এবং সামাজিক বাস্তবতার নিখুঁত রূপায়ণ তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে এক বিশেষ মাত্রা। তাঁর লেখনীতে যেমন ফুটে ওঠে প্রান্তিক জীবনের গূঢ় বাস্তবতা তেমনি থাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশপ্রেম ও মানবিকতার এক ইতিবাচক বার্তা।
সচেতনতামূলক সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ইতিমধ্যে বিভিন্ন জাতীয় আঞ্চলিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান থেকে লাভ করেছেন নানা সম্মাননা ও ভূয়সী প্রশংসা। তবে প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কারের চেয়ে পাঠকদের বিপুল ভালোবাসাকেই তিনি তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করেন।আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে হাবিবুল্লাহ হেলালী এক প্রেরণার নাম। নিভৃত পল্লীতে বসেও যে নিরলস সাধনা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করা যায়, তিনি তা প্রমাণ করেছেন। হাওরপাড় থেকে উঠে আসা এই মহান সাহিত্যিক তাঁর সততা, লেখনীর ধার এবং চিন্তার গভীরতা দিয়ে আগামী দিনে বাংলা সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ ও মহিমান্বিত করবেন—এমনটাই প্রত্যাশা তাঁর অগণিত পাঠক, অনুরাগী ও সুধীসমাজের।




