নতুন সরকার আসার পরেও ঘুস খাওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে: হাসনাত আবদুল্লাহ

নতুন সরকার আসার পরেও ঘুস খাওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপির সংসদ সদস্য (এমপি) হাসনাত আবদুল্লাহ। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ফালতু সফটওয়্যারের হয়রানিমূলক নিবন্ধন সিস্টেম আমূল সংস্কার করুন। বিএমইটি কার্ডের হয়রানি থেকে প্রবাসীদের মুক্ত করুন।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা লেখেন।

পোস্টে তিনি লেখেন, আমরা একটা অভিযোগ পাচ্ছি যে, বিগত এক সপ্তাহ ধরে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো-বিএমইটি কার্ড বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে। ক্লিয়ারেন্স কার্ড পাচ্ছে না লোকজন, তাই আন্দোলনের ঘোষণাও এসেছে। কিন্তু ব্যাক-চ্যানেলে ঠিকই কার্ড দিচ্ছে বেশি টাকায়। নতুন সরকার আসার পরেও ঘুস খাওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে।

বিএমইটি কেন দরকার-এমন প্রশ্ন রেখে তিনি লেখেন, প্রবাসী বা পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে একটি কাজ অপরিহার্য তা হচ্ছে, শ্রমিকদের নিবন্ধনভিত্তিক ডেটাবেজ তৈরি। আপনার দরকার ডেটাবেজ, প্লাস্টিক কার্ডের ব্যবসা জরুরি নয়। ডেটাবেজ হবে এনআইডি ও পাসপোর্ট উভয়ের ডেটার সমন্বয়ে। কোন নাগরিক কোন দেশে, কোন নিয়োগকর্তার অধীনে আছেন, এই তথ্য থাকলে প্রবাসী শ্রমিকের অসুস্থতা, কর্মহীনতা, সিরিয়াস দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুতে তাকে বা তার পরিবারকে সাপোর্ট দেওয়া যায়। পাশাপাশি লাশ ফেরানো, যুদ্ধ বা আঞ্চলিক সংঘাতে সরিয়ে আনা, মজুরি না পেলে দূতাবাসের হস্তক্ষেপ ইত্যাদির জন্য নিখুঁত রেজিস্ট্রেশন দরকার। কিন্তু প্রবাসী কল্যাণ ও বিএমইটি কি সব কাজ ঠিকঠাক করছে? যদি না করে, তাহলে রেজিস্ট্রেশনের নামে তাদের হয়রানির অধিকার কে দিয়েছে?

দাবি জানিয়ে হাসনাত লেখেন, প্রবাসীদের ক্রমাগত হয়রানি থামাতে, বিএমইটিকে গেটকিপার থেকে রেজিস্ট্রারে রূপান্তর করতে হবে। অর্থাৎ, শ্রমিকদের নিবন্ধন প্লাস্টিক কার্ড থেকে সরিয়ে ডেটাবেজভিত্তিক করতে হবে। সঠিক ডেটাবেজের জন্য দরকার-
১। পাসপোর্ট, এনআইডি তথ্য সঠিকতা। এসব তথ্য ম্যানুয়াল ফিল হবে না, সার্ভার থেকে অটোমেটিক আসবে সিকিউর এপিআই করে।
২। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতা (শিক্ষা বোর্ডের ও টিটিসির সঙ্গে সরাসরি এপিআই করা ভেরিফিকেশন)। এখানে হার্ডকপি সার্টিফিকেট যাচাই পুরোপুরি বন্ধ করা হবে।
৩। ভিসা যাচাই এবং প্রবাসী দূতাবাসের এন্ডোর্সমেন্ট। এটা শতভাগ অনলাইন ও এপিআইভিত্তিক হতে হবে।
৪। হেলথ চেক। এখানেও ভিন্ন ভিন্ন দেশের অ্যাপ্রুভড ক্লিনিকের সঙ্গে রিয়েল-টাইম ডেটা ভেরিফিকেশন রাখতে হবে।

এরপরে আসবে-দুর্ঘটনা, অসুস্থতা ও লাশ ফেরানোর মত বীমার তথ্য, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স সুবিধাদির তথ্য। বিদেশে কর্মহীন থাকার তথ্য এবং নেসেসারি সাপোর্ট।

কুমিল্লা-৪ আসনের এই সংসদ সদস্য লেখেন, সাবেক ও বর্তমান সরকার এপিআইভিত্তিক রিয়েল-টাইম সনদ যাচাই পদ্ধতি সম্পর্কে হয় জ্ঞান রাখে না, নাহয় দুর্নীতি ও ঘুষচক্র জারি রেখে দালালচক্র পালাই তাদের উদ্দেশ্য। ফলে, তারা এখনও হার্ডকপি পেপার ভেরিফিকেশনের একটা হয়রানিমূলক ব্যবস্থা চালু রেখেছে। একের পর এক নিম্নমান সফটওয়্যারের মাধ্যমে সেবার নামে হয়রানি চলছে।

বিএমইটির কার্ডের পুরো জাস্টিফিকেশনটাই করা হয়েছিল প্রি-ডিপার্চার ট্রেনিং আর অথেন্টিক ডকুমেন্টস (জব, ভিসা) বাধ্যতামূলক করতে। এমনটি উল্লেখ করে তিনি লেখেন, অথচ বিএমইটি কার্ড দিয়ে ঘুস দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে। শুধু বৈধ ভিসা যাচাই এবং মেডিক্যাল, কিংবা লাশ ফেরানো ও বীমা বরাদ্দ দেওয়ার জন্য বিএমইটির জাস্টিফিকেশন থাকে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন টিটিসিগুলোর (টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার) সার্টিফিকেশন রিয়েল-টাইম এপিআই ভেরিফিকেশনও করা যায়।

তিনি আরও লেখেন, যেহেতু হেলথ করানো হয় বিদেশি দূতাবাসগুলোর ট্রাস্টেড পার্টনার থেকে, তাই এসব ক্ষেত্রে ডকুমেন্ট অনলাইন এপিআই দিয়ে যাচাই করা সহজ হওয়ার কথা। কিন্তু, বাংলাদেশে বিএমইটি ভিসার বৈধতা, দক্ষতার সনদ, পাবলিক পরীক্ষার সার্টিফিকেট কিংবা মেডিক্যাল সনদ ইত্যাদির রিয়েল-টাইম ডেটাবেজ সাপেক্ষে যাচাই করতে পারে না। ফলে, এখানে জাল ডকুমেন্টের ছড়াছড়ি। এ অবস্থায় বিএমইটি থাকার যৌক্তিকতা কোথায়? বিমানবন্দরে প্রবাসীদের হয়রানি করা আর ম্যানপাওয়ার ব্যবসার নামে দালাল পোষার জন্য?

ভারত ও নেপালের উদাহরণ দিয়ে তিনি লেখেন, বাংলাদেশ ভারত-নেপালের প্রবাসী শ্রমিক ম্যানেজমেন্ট থেকে শিক্ষা নিতে পারে। ভারতের মডেলটিই সবচেয়ে শিক্ষণীয়, এবং কারণটি ফি নয় বরং সেবার পরিধি। ভারতে ছাড়পত্র লাগে কেবল তাদের, যাদের পাসপোর্টে ECR সিল আছে, অর্থাৎ যারা দশম শ্রেণি পাস করেননি। মাধ্যমিক পাস করলেই ইসিএনআর (ECNR) ক্যাটাগরি, কোনো ছাড়পত্র লাগে না। ছাড়পত্র লাগলেও তা কেবল নির্দিষ্ট ১৮টি দেশের জন্য। পুরো প্রক্রিয়া (emigrate ডট gove ডট in) এ অনলাইন, ফি ২০০ রূপি, আবেদনের দিনই পিওই (POE) ছাড়পত্র দেন। অনলাইনে এবং হয়রানি ছাড়া। অর্থাৎ, ভারত প্রবাসী সেবা অনলাইন ও পলিসিভিত্তিক সহজ ও উন্মুক্ত করে সংস্থার আওতা সংকুচিত করেছে। শিক্ষার একটি ন্যূনতম মান পার হলেই রাষ্ট্র ধরে নিচ্ছে, নাগরিক নিজের সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। বাস্তবে এটা কাজ করছে।

এনসিপির এই নেতা আরও লেখেন, ২০১৫ সাল থেকে নেপাল তাদের ফ্রি ভিসা, ফ্রি টিকিট-নীতি বাস্তবায়ন করেছে, যেখানে সাতটি প্রধান গন্তব্যে ভিসা ও বিমানভাড়া নিয়োগকর্তার দায়। এর ফলে নেপালের প্রবাসী শ্রমিকও বেড়েছে, দালালের দৌরাত্ম্য ও খরচ দুটোই কমেছে। ভারতে POE / eMigrate (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) এর মাধ্যমে দূতাবাস-সত্যায়িত চুক্তিপত্র এবং নিয়োগকর্তার নিবন্ধন করে থাকে। কেবল ECR পাসপোর্টধারী, কেবল ১৮টি দেশের জন্য ছাড়পত্র লাগে। অদক্ষ শ্রমিক ও নারী শ্রমিকের ক্ষেত্রে ভারতীয় দূতাবাসের সত্যায়ন বাধ্যতামূলক।

এতে করে যাচাইয়ের একটি প্রকৃত ভিত্তি থাকে বলে মন্তব্য করেন তিনি। হাসনাত লেখেন, বাংলাদেশে সেই ভিত্তিটিই দুর্বল, ফলে ছাড়পত্র হয়ে দাঁড়ায় একটি সিল, যাচাই নয়। চাইলে ইমিগ্রেশনের ফোর-ট্র্যাক সফটওয়্যারেও একটি প্রবাসী সাপোর্ট ডেটা ফিল্ড খোলা যায়। এখানে ভিসা-পাসপোর্ট ম্যাপিং ডেটাবেজ, মেডিকেল রেকর্ড এবং টিটিসির সনদের রিয়েল-টাইম এপিআই যাচাই সম্ভব। কোনো নতুন প্রকল্প লাগে না, বিদ্যমান সিস্টেমের ইন্টারঅপারেবিলিটি করলেই হয়।

শেষে তিনি লেখেন, বিশ্বব্যাংকের হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যয় প্রায় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ-সৌদি আরব, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ-কাতার, বাংলাদেশ-আরব আমিরাত, বাংলাদেশ-কুয়েত করিডোরে পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে গড় খরচ ৪ দশমিক ১৭ লাখ টাকা, যা তুলতে লাগে ১৭ দশমিক ৬ মাস। বাস্তবে ঘুস দালালচক্র এবং এয়ারপোর্ট কমিশনের পরে লাগে ৫ লাখের বেশি। অর্থাৎ, বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের অবস্থা ভয়াবহ।
প্রবাসীদের হয়রানিমুক্ত সেবা দিতে, ফালতু সফটওয়্যারের হয়রানিমূলক নিবন্ধন সিস্টেম আমূল সংস্কার করুন। বিএমইটি কার্ডের হয়রানি থেকে প্রবাসীদের মুক্ত করুন।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top