চট্টগ্রামে গার্মেন্টসের চাকরির নথিতে জন্মতারিখ ও পিতার নামে ভিন্নতা, জান্নাতুল ফেরদৌসকে ঘিরে অনুসন্ধানের চতুর্থ পর্ব (প্রকাশ)

 জাতীয় পরিচয়পত্র ও গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীসংক্রান্ত নথিতে জন্মতারিখ, পিতার নাম ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের গরমিলের অভিযোগ উঠেছে জান্নাতুল ফেরদৌসকে ঘিরে। একই সঙ্গে পারিবারিক বিরোধ, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ, চার বছর বয়সী শিশুর অভিভাবকত্ব এবং আদালত ও থানায় পাল্টাপাল্টি মামলা নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের চতুর্থ পর্বে উঠে এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
নথিতে জন্মতারিখ ও পিতার নাম নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিবেদকের হাতে আসা নথির তথ্য অনুযায়ী, ‘ফেরদৌস আক্তার’ নামের একটি জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ১ জানুয়ারি ১৯৮৮ এবং পিতার নাম রফিকুল ইসলাম উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, ইয়ংওয়ান বাংলাদেশ-এর কেএসআই গার্মেন্টস-০১ ইউনিটের নামে উপস্থাপিত কর্মচারীর বিস্তারিত প্রতিবেদনে ‘জান্নাতুল ফেরদৌস’ নামের একজন কর্মীর জন্মতারিখ ২ নভেম্বর ১৯৯১ এবং পিতার নাম মো. জেবুল হোসেন উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্মস্থলের ওই নথিতে কর্মচারী আইডি ২০৩৬৬৮৬৩, পদবি অপারেটর এবং যোগদানের তারিখ ১১ অক্টোবর ২০১৫ উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি আনোয়ারা উপজেলার পূর্ব বৈরাগ ও জুইদণ্ডী এলাকার ঠিকানা এবং পারিবারিক তথ্যও নথিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
দুটি নথিতে নাম, জন্মতারিখ ও পিতার পরিচয়ে পার্থক্য থাকায় প্রশ্ন উঠেছে, এই তথ্যের অমিলের কারণ কী এবং নথি দুটি একই ব্যক্তির কি না। তবে মূল নথি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড ও নির্বাচন কমিশনের তথ্য যাচাই না করে কোনো ধরনের জালিয়াতি বা প্রতারণার অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য বলা যাচ্ছে না।
টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
এদিকে, এনামুল হক নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, তাঁর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান আসবাবপত্র নিয়ে গেছেন। এ ঘটনায় তিনি গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আনোয়ারা থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে দাবি করেন।
এনামুল হকের আরও অভিযোগ, তাঁদের চার বছর বয়সী শিশুকে ঘিরে পারিবারিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, এ পরিস্থিতিতে শিশুটির মাতৃস্নেহ ও যথাযথ অভিভাবকত্ব নিশ্চিত করা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তবে সম্পদ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ, শিশুর বর্তমান অবস্থা এবং অভিভাবকত্বের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও প্রামাণ্য নথির মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
আদালতের মামলা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
এনামুল হকের দাবি, চট্টগ্রামের বিজ্ঞ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সি.আর. মামলা নং ৭৩২/২৬ দায়ের করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের ওই মামলায় তাঁকে এবং তাঁর বাবা-মাকে আসামি করা হয়েছে। তিনি মামলাটিকে হয়রানিমূলক বলে অভিযোগ করেছেন।
অন্যদিকে, জান্নাতুল ফেরদৌস আদালতে মামলা করার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বলে এনামুল হক জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জান্নাতুল ফেরদৌস স্বামীর বাসা ছেড়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করলেও এনামুল হকের বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা অস্বীকার করেন।
তবে আদালতের মামলার আরজি ও সংশ্লিষ্ট নথি সরাসরি যাচাই করা সম্ভব না হওয়ায় মামলার প্রকৃত বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা যায়নি।
তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন, পুলিশের বক্তব্য
এনামুল হক অভিযোগ করেন, আনোয়ারা থানায় লিখিত অভিযোগ করার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ইমাম অভিযুক্ত পক্ষের হয়ে তাঁকে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, এসআই ইমাম বলেছেন, এনামুল হকের লিখিত অভিযোগের কাগজ তিনি পাননি বলে তাঁর বক্তব্য। ফলে অভিযোগ জমা দেওয়া ও থানায় তা গ্রহণের বিষয়টি যাচাই করা জরুরি।
আনোয়ারা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জুনায়েদ এ বিষয়ে বলেন, অভিযোগ ও মামলা তদন্তে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ
এনামুল হক আরও অভিযোগ করেন, জান্নাতুল ফেরদৌসের মা আম্বিয়া খাতুন মোবাইল ফোনে সাংবাদিককে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ, মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সামগ্রিক ঘটনায় জাতীয় পরিচয়পত্র ও কর্মস্থলের নথির অমিল, পারিবারিক বিরোধ, সম্পদ নিয়ে অভিযোগ এবং আদালতের মামলার প্রকৃত অবস্থা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে চার বছর বয়সী শিশুর কল্যাণ ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও আদালতের নথি যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করা গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে  স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্‌ঘাটন এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top